জেড নিউজ, ডেস্ক :
অর্থসংকটের কারণে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে গাজার ২০টির বেশি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডিজেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর ফলে জ্বালানিনির্ভর জেনারেটর চালানো কঠিন হয়ে পড়বে এবং হাসপাতালগুলোর অস্ত্রোপচার, নিবিড় পরিচর্যা, জরুরি চিকিৎসা ও জীবনরক্ষাকারী বিভিন্ন সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ বক্তব্যের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুরশ সোমবার জানান, জ্বালানি ও ইঞ্জিন অয়েলের তীব্র সংকটের মধ্যেই ডব্লিউএইচও ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২০টির বেশি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডিজেল সরবরাহ বন্ধের কথা জানিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যে অল্প পরিমাণ জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়েই কোনোভাবে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো সচল রাখা হচ্ছে। নতুন করে সরবরাহ বন্ধ হলে বিদ্যমান সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
আল-বুরশ বলেন, ডিজেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে হাসপাতালের জেনারেটর চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। এতে অস্ত্রোপচারকক্ষ, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র ও জরুরি বিভাগসহ বিদ্যুৎনির্ভর চিকিৎসাসেবা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ভেন্টিলেটর, অক্সিজেন সরবরাহব্যবস্থা, ইনকিউবেটর ও অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি সচল রাখাও কঠিন হয়ে পড়বে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে ইনকিউবেটরে থাকা নবজাতক, ডায়ালাইসিসনির্ভর রোগী, গুরুতর আহত ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীরা।
গাজার চিকিৎসা খাতের জ্বালানি সংকট যে ইতোমধ্যে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতেও তার প্রমাণ মিলছে। ১০ সেপ্টেম্বর গাজার আল-আহলি আরব হাসপাতালের প্রধান জেনারেটর তেল ও যন্ত্রাংশের সংকটে বন্ধ হয়ে যায়। এতে হাসপাতালের ইমেজিং বিভাগ, এমনকি উত্তর গাজার একমাত্র সিটি স্ক্যানারও বন্ধ রাখতে হয় এবং কয়েকটি অস্ত্রোপচার পিছিয়ে দেওয়া হয়।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় হাসপাতালগুলো জেনারেটরের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু জ্বালানি, ইঞ্জিন অয়েল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সংকটে একাধিক হাসপাতাল বিদ্যুৎ ব্যবহারে রেশনিং করতে বাধ্য হচ্ছে। নাসের হাসপাতালেও বিভিন্ন ভবনে পালাক্রমে বিদ্যুৎ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে ভেন্টিলেটরসহ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন এমন রোগীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সংকট শুধু হাসপাতালের জেনারেটরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। অ্যাম্বুলেন্স চলাচল, ওষুধ ও টিকা সংরক্ষণের শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারের ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। ফলে জরুরি রোগী পরিবহন থেকে শুরু করে অস্ত্রোপচার ও অন্যান্য চিকিৎসাসেবা পর্যন্ত পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
ফিলিস্তিন মেডিক্যাল রিলিফ সোসাইটির পরিচালক মোহাম্মদ আবু আফাশের বরাতে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩টি হাসপাতাল ও সাতটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে ডিজেল সরবরাহ বন্ধের বিষয়ে জানানো হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জেনারেটর ও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা বিভাগ পরিচালনায় ডব্লিউএইচওর সরবরাহ করা জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এদিকে ডব্লিউএইচও নিজস্ব ২০২৬ সালের জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তা পরিকল্পনায় জানিয়েছে, গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং সেখানে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন এখনো ব্যাপক। সংস্থাটি বলছে, হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপের মধ্যে কাজ করছে এবং স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো, সরবরাহ ও চিকিৎসা সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে চলতি বছর বিশ্বজুড়ে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখতে ডব্লিউএইচওর প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
২ সেপ্টেম্বর ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসও গাজার মানবিক ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতির অবনতির কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ইতোমধ্যে ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য সরঞ্জামের প্রবেশাধিকারও সীমিত। সংস্থাটি গাজায় রোগ নজরদারি, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখতে কাজ করছে।
মুনির আল-বুরশ বলেন, ডিজেল সরবরাহ বন্ধের বিষয়টি কেবল সাময়িক জ্বালানি সংকট হিসেবে দেখলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যাবে না। তার মতে, জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হলে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে কার্যক্রম বন্ধের দিকে ঠেলে যেতে পারে এবং চিকিৎসাযোগ্য রোগীরও প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়বে।
এ অবস্থায় জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখা এবং হাসপাতালগুলোর জরুরি সেবা সচল রাখতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ডব্লিউএইচও, দাতা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ কর্মকর্তা।




