জেড নিউজ ডেস্ক :
১৫ শতকের রেনেসাঁ যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী আন্তোনেল্লো দা মেসিনা। গত শনিবার সন্ধ্যায় ইতালির সিসিলি দ্বীপের মেসিনা শহরের একটি মু-মে জাদুঘর থেকে চুরি হয়েছে তার চারটি চিত্রকর্ম। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
ধারণা করা হচ্ছে, শহরে অনুষ্ঠিত বিশাল ধর্মীয় উৎসব লা ভারার দিকে মানুষের মনোযোগ থাকায় চোর এ সুযোগ নেয়। ১৫ আগস্ট ইতালিতে ‘ফেরাগোস্তো’ নামে জাতীয় ছুটি পালিত হয়।
জাদুঘরের অ্যালার্ম ব্যবস্থা এড়িয়ে একটি নিরাপত্তাবেষ্টিত প্রদর্শনী বাক্স ভেঙে আন্তোনেল্লোর আঁকা কাঠের চারটি প্যানেল নিয়ে যায় চোর। রেনেসাঁস শিল্পের গতিপথ বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন এ সিসিলিয়ান শিল্পী।
চুরি যাওয়া চারটি চিত্রের মধ্যে তিনটি ছিল ‘পলিত্তিকো দি সান গ্রেগোরিও’ নামের একটি বেদিচিত্রের অংশ। এটি আন্তোনেল্লোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি। বর্তমানে এ বেদিচিত্রের পাঁচটি প্যানেল টিকে আছে।
জাদুঘরের পরিচালক মারিসা মার্কুরিও বলেন, ‘শুধু মেসিনা নয়, পুরো সিসিলির জন্যই বিপুল সাংস্কৃতিক, শিল্পকলা ও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে এমন শিল্পকর্ম চুরি হয়েছে। এখন আমাদের একমাত্র আশা— এগুলো যত দ্রুত সম্ভব উদ্ধার হবে।’
মূলত ছয়টি প্যানেল নিয়ে সান গ্রেগোরিও মঠের জন্য বেদিচিত্রটি তৈরি হয়েছিল। ১৯০৮ সালের মেসিনা ভূমিকম্পে মঠটি ধ্বংস হয়ে যায়। এই বেদিচিত্র ছিল আন্তোনেল্লোর একমাত্র শিল্পকর্ম, যা কখনোই তার নিজের শহর মেসিনার বাইরে যায়নি।
চুরি হওয়া চতুর্থ চিত্রটি ছিল ছোট আকারের একটি দুই পৃষ্ঠে আঁকা চিত্র। এর এক পাশে দেখা যায় কুমারী মেরি ও শিশু যিশুকে, সঙ্গে একজন ফ্রান্সিসকান সন্ন্যাসী; অন্য পাশে রয়েছে খ্রিষ্টের ছবি।
চিত্রটি একসময় উইলহেল্ম সোলদানের সংগ্রহে ছিল। ২০০৩ সালে ক্রিস্টি’জের মাধ্যমে এটি সিসিলির আঞ্চলিক সরকারের কাছে বিক্রি করা হয়। ওই বছরই চিত্রটির শিল্পী হিসেবে আন্তোনেল্লো দা মেসিনার নাম নিশ্চিত করা হয়েছিল।
চোরের দল আরো বেশি শিল্পকর্ম নিয়ে যেতে পারত। মোট ছয়টি চিত্র জাদুঘর থেকে বের করা হয়েছিল। তবে রহস্যজনকভাবে দুটি প্যানেল জাদুঘরের বাইরে একটি নিচু দেয়ালের ওপর ফেলে রেখে যায় তারা।
ধারণা করা হয়, ১৪৩০ সালের দিকে আন্তোনেল্লোর জন্ম। তিনি নেপলসে শিল্পের প্রশিক্ষণ নেন। সেখানে তিনি প্রোভঁস ও ফ্লেমিশ শিল্পীদের কাজ নিয়ে পড়াশোনা করেন। তার শিল্পকর্মে সেই প্রভাব স্পষ্ট।
মেসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত শিল্প-ইতিহাসবিদ ভ্যালেন্তিনা চের্তো বলেন, ‘এই চুরি মেসিনা শহরের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর আঘাত। এসব শিল্পকর্ম ভূমিকম্প, ধ্বংসযজ্ঞ ও পাঁচ শতাব্দীর ইতিহাস পেরিয়ে টিকে ছিল। এখন সেগুলো এভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে—এই ক্ষতি শুধু অর্থের হিসাবে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।’
১৯০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর মেসিনায় ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। ৩৭ সেকেন্ড স্থায়ী ওই ভূমিকম্পে শহরের প্রায় অর্ধেক মানুষ নিহত হন এবং শহরের বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে এটিকে এখনো সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি, গির্জা ও বিভিন্ন স্থাপনার পাশাপাশি বহু মূল্যবান ঐতিহাসিক নথি ও শিল্পকর্মও ধ্বংস হয়ে যায়। এর মধ্যে আন্তোনেল্লোর কিছু কাজও ছিল।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইতালি সরকার নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এক নিলাম থেকে আন্তোনেল্লোর একটি বিরল মাস্টারপিস কিনেছিল। ‘এচে হোমো’ নামের ওই চিত্রের জন্য ১ কোটি ৪৯ লাখ ডলার খরচ করা হয়। সদবি’সের নিলামে বিক্রি হওয়া চিত্রটিতে যন্ত্রণাকাতর খ্রিষ্টের মানবিক অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ধারণা করা হয়, এটি প্রায় ১৪৬০ সালে আঁকা হয়েছিল।
চুরির ঘটনায় মেসিনার প্রসিকিউটররা তদন্ত শুরু করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, জাদুঘরে একাধিক নজরদারি ক্যামেরা ছিল এবং শিল্পকর্মগুলো অত্যাধুনিক অ্যালার্ম ব্যবস্থার মাধ্যমে সুরক্ষিত ছিল। চিত্রকর্মগুলো অবৈধ শিল্পবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে চুরি করা হয়েছিল কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
এই চুরির মাত্র এক দিন আগে ফরাসি শিল্পী পল সেজান, পিয়ের-অগুস্ত রেনোয়া ও অঁরি মাতিসের তিনটি চিত্রকর্ম উদ্ধার করে ইতালির পুলিশ। চলতি বছরের শুরুর দিকে একটি ব্যক্তিগত জাদুঘর থেকে এগুলো নিয়ে যায় চোরের দল।





