spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

কল্পনা থেকে বাস্তবের বাগানে ‘নীল গোলাপ’

জেড নিউজ, ডেস্ক :

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে অসম্ভবকে উপমায় বন্দি করে রেখেছিল মানুষ, যা ছিল কেবল অলীক বাসনা আর অপূর্ণ প্রেমের রূপক সেই নীল গোলাপ এবার তার অবাস্তবের খোলস ভেঙে পৃথিবীর মাটিতে ফুটে উঠেছে। শতাব্দীর প্রাচীন সেই পদ্যাংশ, ‘গোলাপ মানেই লাল’ তার একচ্ছত্র আধিপত্য হারাল। মানুষের কল্পনা যেখানে থমকে দাঁড়িয়েছিল, বিজ্ঞান ঠিক সেখান থেকেই তুলে এনেছে নীল গোলাপকে, পাপড়ির অবয়বে।

গোলাপ মানেই লাল, কখনো সাদা, কখনো হলুদ কিংবা গোলাপি। কিন্তু নীল? প্রকৃতি যেন সেখানে এসে থেমে গিয়েছিল। ফুলের পৃথিবীতে নীল আছে আইরিসে, জেনশিয়ানে, ক্যান্টারবেরি বেলে তবে শুধু গোলাপের পাপড়িতেই সেই রঙটি ছিল ‘নিষিদ্ধ’।

নীল গোলাপ তৈরির স্বপ্ন অবশ্য নতুন নয়। সমস্যাটা ছিল গোলাপের নিজস্ব জৈব রসায়নে। গোলাপ লাল ও হলুদ রঞ্জক তৈরি করতে পারে, কিন্তু নীল রঙের জন্য প্রয়োজনীয় একটি বিশেষ এনজাইম তার নেই।

সেই শূন্যতা ২০০৪ সালে প্রথম নড়েচড়ে বসেছিল জাপানের কিয়োটোভিত্তিক সানটোরি গ্লোবাল ইনোভেশন সেন্টারের গবেষকেরা। জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে গোলাপের ভেতরে এমন একটি জিন বসানো হয়, যা ‘ডেলফিনিডিন’ নামের নীল রঞ্জক তৈরিতে প্রয়োজনীয় এনজাইম উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু সেই প্রয়াস প্রকৃতির গোপন জেদের কাছে সামান্য ম্লান হয়ে ধরা দিয়েছিল, গোলাপটি তখনো নীল হতে পারেনি, রয়ে গিয়েছিল বেগুনি আবেশে। কারণ, কেবল নীল রঞ্জক থাকলেই তো আর ফুল আকাশ হয়ে ওঠে না; তার রূপকে গভীর করতে প্রয়োজন হয় আরেক অদৃশ্য সঙ্গীর।

প্রকৃতির নীল ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে গবেষকেরা পরের সূত্রটি খুঁজে পান। আইরিসের মতো স্বাভাবিকভাবে নীল ফুল শুধু ডেলফিনিডিনজাত রঞ্জক তৈরি করে না, তাদের ভেতরে থাকে প্রায় বর্ণহীন কিছু সহায়ক অণু। এগুলোকে বলা হয় ‘ফ্ল্যাভোন সি-গ্লাইকোসাইড’। নিজেরা প্রায় রংহীন হলেও নীল রঞ্জককে স্থিতিশীল করে তার রংকে আরো গভীর ও স্পষ্ট করে তোলে এই অণুগুলো। গোলাপের সমস্যা ছিল এখানেও। এসব সহায়ক উপাদান তৈরির প্রয়োজনীয় জিনও তার নেই।

তাই এবার গবেষকেরা শুধু একটি রঙের জিন বসাননি; যেন প্রকৃতির বিভিন্ন ফুল থেকে ধার করে এনেছেন নীল হয়ে ওঠার পুরো ব্যাকরণ। একটি হালকা গোলাপি গোলাপের জিনে সংযোজন করা হলো চারটি ভিন্ন ফুলের গোপন নকশা। ক্যান্টারবেরি বেলস এনে দিল একাধিক নীল রঞ্জক তৈরির ক্ষমতা, উইশবোন আর ক্লাস্টার্ড জেনশিয়ান ধার দিল সেই বর্ণহীন সহায়ক অণু তৈরির রসায়ন। বিজ্ঞানের চমৎকারে ডেলফিনিডিনকে ছাপিয়ে ম্যালভিডিন ও আইসোঅরিয়েন্টিন যখন একীভূত হলো, পাপড়ির ক্যানভাসে জন্ম নিল নীল আভা। দেখ মিলল নীর গোলাপের। কাগজের মানদণ্ডে হয়তো একে বলা হচ্ছে ‘ভায়োলেট ব্লু’। অর্থাৎ আকাশের নির্মল নীল কিংবা সমুদ্রের গভীর নীল এখনো পুরোপুরি ধরা দেয়নি গোলাপের পাপড়িতে। তবু এটি আর আগের সেই বেগুনি গোলাপ নয়, যাকে কল্পনায় নীল বলে মেনে নিতে হতো।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, রংটি ক্ষণিকের পরীক্ষাগারের বিস্ময়ও নয়। জাপানের গ্রিনহাউসে সাত বছর ধরে এসব গোলাপগাছ নীল ফুল দিয়েছে। কলম্বিয়ার খোলা মাঠেও তিন বছর ধরে একই বৈশিষ্ট্য টিকে আছে। গবেষকেরা এখন রংটিকে আরো গভীর, আরো প্রকৃত নীল করে তোলার চেষ্টা করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়