জেড নিউজ ডেস্ক :
ভঙ্গুর ব্যাংক খাত ঠিক করতে নতুন করে বড় অঙ্কের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। বিশ্বব্যাংকের ঋণসহায়তায় পাঁচ বছরের একটি প্রকল্পের প্রস্তাব আজ মঙ্গলবার অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় উঠছে। প্রকল্পের মোট খরচ ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা।
প্রকল্পের নাম ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২, সংক্ষেপে এফএসএসপি-২। বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক। সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় একনেক সভার কার্যতালিকায় আজ মোট ১৫টি প্রকল্প রয়েছে, এটি তার একটি।
মোট ব্যয়ের প্রায় পুরোটাই আসবে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) থেকে। সংস্থাটি দেবে ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। বাকি ১৪ কোটি টাকা জোগাবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে। প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্প প্রস্তাবে ব্যাংক খাতের বেশ কিছু দুর্বলতা স্বীকার করা হয়েছে। এগুলো হলো দীর্ঘদিনের উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব। কিছু ব্যাংক এখন তারল্য ও মূলধন সংকটে আছে। কয়েকটির মূলধন নেতিবাচক হয়ে গেছে, অর্থাৎ দায় মেটানোর মতো পুঁজিও নেই। সংকটে থাকা ব্যাংকের মধ্যে সরকারি ও ইসলামি ব্যাংকের কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো তথ্যপ্রযুক্তি কাঠামো। ব্যাংকগুলোর তথ্য একসঙ্গে সমন্বয় করার ব্যবস্থাও দুর্বল। ফলে তদারকি সংস্থার কাজ সীমিত হয়ে পড়ছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এই দুর্বলতা সাইবার হামলা ও সীমান্ত পেরোনো আর্থিক ঝুঁকি সামলানোর ক্ষেত্রেও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আগের ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্টের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হচ্ছে।
প্রকল্প তিন ধাপে এগোবে। প্রথম ধাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো হবে এবং প্রযুক্তি কাঠামো গড়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে থাকবে আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদার করা, ব্যাংক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কার। তৃতীয় ধাপে দেওয়া হবে প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা।
আমানতকারীদের সুরক্ষা এ প্রকল্পের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য। এর অংশ হিসেবে আমানত বিমা তহবিলের আর্থিক সামর্থ্য বাড়ানো হবে। কোনো ব্যাংক বন্ধ বা পুনর্গঠনের পথে গেলে আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে এখন যে সময় লাগে, তা কমানোর চেষ্টা থাকবে। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও বাড়ানো হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় বিশেষ জোর থাকবে। সংস্কারের ক্ষেত্রে কার্যসম্পাদনভিত্তিক শর্ত ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে। সহজ ভাষায়, আগে থেকে ঠিক করা কাজ ও ফলাফল অর্জিত হলেই সংস্কারের পরের ধাপে যাওয়া যাবে।
খরচের হিসাবে প্রযুক্তিই সবচেয়ে বড় খাত। তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জামে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৭১১ কোটি টাকা। কম্পিউটার সফটওয়্যারে রাখা হয়েছে ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। দুটি মিলিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৬৬ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকল্পের মূল ভরসা প্রযুক্তি কেনাকাটার ওপর।
প্রশিক্ষণে ধরা হয়েছে ৭০ কোটি টাকা। এতে ৩ হাজার ৫৬৫ জন প্রশিক্ষণ পাবেন। গড় হিসাবে জনপ্রতি খরচ প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। পরামর্শক সেবায় খরচ প্রস্তাব করা হয়েছে মোট ৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি পরামর্শকের জন্য ২৯ কোটি এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শকের জন্য ৬৫ কোটি টাকা। ডেটাবেজসহ অন্যান্য প্রযুক্তিসামগ্রীর জন্যও অর্থ আছে।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানিয়েছেন, আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা কাটাতেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও ক্রয়প্রক্রিয়া আধুনিক করার মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনা হবে। পাশাপাশি নীতিগত পর্যায়েও নানা সংস্কার হবে। পরিকল্পনা কমিশনও প্রস্তাব পর্যালোচনা করে ইতিবাচক মত দিয়েছে। তাদের মূল্যায়নে, বাস্তবায়িত হলে আর্থিক খাতের নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রযুক্তিনির্ভর হবে এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম সহায়তা পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি অবশ্য একটি সতর্কতাও দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার হলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি সামলানো সহজ হবে। তবে শুধু যন্ত্র ও সফটওয়্যার কিনলেই সমস্যা মিটবে না। সেগুলো চালানোর জন্য দক্ষ লোকবল গড়ে তোলাও জরুরি। তিনি প্রকল্প পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন।
ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্টের প্রথম পর্যায় অনুমোদন পায় ২০১৫ সালে। সেটি বাস্তবায়িত হয় ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০ কোটি ডলার। শেষে প্রকৃত খরচ হয় ২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার কম। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওই পর্যায়ে তিনটি প্রধান কাজ হয়েছিল। এর একটি ছিল আর্থিক খাতের ডিজিটাল অবকাঠামো গড়া। আরেকটি ছিল ব্যাসেল কোর নীতিমালা অনুসরণে কাজ করা।
এ প্রকল্পের সাফল্য শুধু অনুমোদনে নয়, বাস্তবায়নের মানে নির্ভর করবে। তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, খরচের ভারসাম্য। মোট বরাদ্দের বড় অংশ যন্ত্র ও সফটওয়্যার কেনায় গেলে ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। সচিবের নিজের বক্তব্যেও এই স্বচ্ছতার কথা এসেছে।
দ্বিতীয়ত, মানুষের সক্ষমতা। সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদের সতর্কবার্তা এখানেই প্রাসঙ্গিক। প্রশিক্ষণে বরাদ্দ মোট ব্যয়ের তুলনায় সামান্য। এই অর্থে প্রশিক্ষিত জনবল কতটা তৈরি হবে, সেটিই ঠিক করবে প্রযুক্তি কাজে লাগবে কি না।
তৃতীয়ত, আমানতকারীর আস্থা। আমানত বিমা তহবিল শক্ত হলে এবং টাকা ফেরতের সময় কমলে সংকটে থাকা ব্যাংকের গ্রাহকেরা কিছুটা নিরাপত্তা পাবেন। তবে খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের মূল সমস্যা এই প্রকল্প একা মেটাতে পারবে না। এর জন্য নীতিগত সংস্কার ও কঠোর তদারকিও লাগবে।
সব মিলিয়ে প্রকল্পটি ব্যাংক খাতের প্রযুক্তি ও সুরক্ষা কাঠামো নতুন করে সাজানোর একটি বড় সুযোগ। সেই সুযোগ কাজে লাগবে কি না, তা নির্ভর করবে সময়মতো, স্বচ্ছভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নের ওপর।





