জেড নিউজ, ঢাকা:
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজার সম্ভাবনা, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা, প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান এবং বাংলাদেশের করণীয় বিশ্লেষণ করে পৃথক বাজারভিত্তিক রপ্তানি কৌশল প্রণয়ন করছে সরকার। এ পরিকল্পনার আওতায় ৫৪টি পণ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি বাজারের জন্য সম্ভাবনাময় পণ্য চিহ্নিত করার পাশাপাশি ওই বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান, প্রতিযোগী দেশগুলোর সক্ষমতা এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় রপ্তানি বাড়ানোর কৌশল নির্ধারণের আওতায় রয়েছে ২০টি দেশ। এগুলো হলো–ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জাপান, কানাডা, বেলজিয়াম, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ফিজি। এক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ফিজিকে একটি অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক (নিট ও ওভেন), পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ব্যাগ ও ভ্রমণসামগ্রী, জুতা, বস্ত্র ও অন্যান্য তৈরি টেক্সটাইল সামগ্রী, হোম টেক্সটাইল, হোম ডেকর, টুপি ও হেডগিয়ার, ওষুধ, আসবাব, খেলনা, ক্রীড়া ও বিবিধ সামগ্রী, সাইকেল, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, ফ্যানসহ ভোগ্য ইলেকট্রনিক্স, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিক পণ্য, সিরামিক ক্রোকারিজ, ছুরি, কাঁটাচামচ ও ধাতব গৃহস্থালি সামগ্রী, লোহা ও ইস্পাত, কাগজ, মাছ ও সামুদ্রিক পণ্য, চিংড়ি, কাঁকড়া, ঝিনুক, ফলমূল ও সবজি, ফল ও বাদাম, প্রক্রিয়াজাত ও হালাল খাদ্য, ভোজ্যতেল, চা, তামাকজাত পণ্য, পানীয় এবং পোষা প্রাণীর পণ্য। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ‘বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন স্ট্র্যাটেজি: প্রোডাক্ট অ্যান্ড মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন অ্যাক্রোস এইটিন কী ট্রেডিং ডেস্টিনেশনস’ শীর্ষক কর্মশালায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান বলেন, দেশের রপ্তানিকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে পণ্য বৈচিত্র্যকরণ এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণ–দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচিত ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশভিত্তিক প্রোফাইল এবং বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এসব তথ্য সমন্বয় করে প্রতিটি দেশের জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে জানিয়ে বাণিজ্য সচিব বলেন, এর মাধ্যমে কোন বাজারে কোন পণ্যের সম্ভাবনা বেশি, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী কারা এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন তা আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
কেন এখনই এ উদ্যোগ
কর্মশালায় উপস্থাপিত প্রবন্ধ অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইবিএ, জিএসপিসহ শুল্কমুক্ত সুবিধাগুলো ধাপে ধাপে বন্ধ হবে। ইইউর ক্ষেত্রে সময়সীমা ধরা হয়েছে ২০২৯ সাল, তবে তা পরিবর্তনসাপেক্ষ। অথচ দেশের রপ্তানি এখনও মূলত তৈরি পোশাকনির্ভর। তাই পাট, চামড়া, সামুদ্রিক খাদ্য, ওষুধ, প্লাস্টিক, কৃষিজ খাদ্য ও হালকা প্রকৌশল পণ্যে বাড়তি জোর দেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে ১৮টি বাজারে ৫৪টি পণ্যের সম্ভাবনা যাচাই করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের বেশ কিছু পণ্যের বড় সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমান রপ্তানি তুলনামূলকভাবে খুবই কম। যেমন, দেশটির আসবাব আমদানির পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এর বিপরীতে বাংলাদেশ রপ্তানি করে মাত্র ৫৮ লাখ ৬০ হাজার ডলারের আসবাব। ১ হাজার ৩৮০ কোটি ডলারের খেলনার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ৫৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার। যুক্তরাজ্যের ২ হাজার ৭৬৬ কোটি পাউন্ডের ওষুধ আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ২৫ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড। ফ্রান্সে চামড়া, ব্যাগ ও জুতা আমদানি হয় ১ হাজার ৫৪৮ কোটি ডলারের। সেখানে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ২১ কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার ডলার বা ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। একইভাবে জাপান, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ড, রাশিয়া, ইরান, ব্রাজিল, তুরস্কসহ অন্য দেশগুলোতেও সম্ভাবনার তুলনায় রপ্তানি কম হচ্ছে।
সরকারের কৌশল
জানা গেছে, কৌশলপত্রে দেশীয় সংস্কার ও দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ–দুই ধারায় পদক্ষেপ সাজানো হচ্ছে। দেশের ভেতরে পণ্য ও নকশায় বৈচিত্র্য আনা, লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি), রিচ, এফডিএ, হালালসহ আন্তর্জাতিক সনদ নিশ্চিত করা, হিমাগার ও পরীক্ষাগার গড়া, সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর এবং একটি এপিআই শিল্পপার্ক স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। সঙ্গে থাকবে ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ প্রচার ও বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ। দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ দ্রুত চূড়ান্ত করা, জাপানের সঙ্গে ইপিএ বাস্তবায়ন, মারকোসুর-ব্রাজিলের সঙ্গে আলোচনা এবং ইরান ও তুরস্কের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে। ভারতের সঙ্গে বিএসটিআই-বিআইএস পারস্পরিক স্বীকৃতি, ক্রেতা-বিক্রেতা প্রতিনিধি দল বিনিময় এবং চামড়া, ওষুধ ও পাটে যৌথ বিনিয়োগও পরিকল্পনায় আছে।
সময়ভিত্তিক রূপরেখায় প্রথম বছরে বাণিজ্য মেলা ও সনদ যাচাই, এক থেকে তিন বছরে চুক্তি সম্পন্ন ও অবকাঠামো গড়া এবং তিন থেকে সাত বছরে পোশাকের বাইরে পূর্ণাঙ্গ বৈচিত্র্য অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। বাজারগুলোকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম স্তরে চীন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কোরিয়া। দ্বিতীয় স্তরে জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড-ফিজি, ভারত ও আমিরাত। তৃতীয় স্তরে রাশিয়া, তুরস্ক, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইরান।
চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্টদের মতে, রপ্তানি সম্প্রসারণে প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হলো এলডিসি উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা হারানো। ভারত, তুরস্ক, জাপান, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের মতো শুল্ক ছাড় দেয় না। ফলে এসব বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে নতুন বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন হবে। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ সনদ, মান ও পণ্য অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতা। ভারতের বিএসআই, চীনের খাদ্যনিরাপত্তা বিধি, ইউরোপের রিচ (আরইএএইচ) বিধিমালা এবং ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের এমএইচআরএ, যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ ও অস্ট্রেলিয়ার টিজিএর অনুমোদনসংক্রান্ত শর্ত বাংলাদেশের রপ্তানির ক্ষেত্রে বারবার বাধা হিসেবে উঠে এসেছে।
তৃতীয় বড় চ্যালেঞ্জ লজিস্টিকস ও পরিবহন ব্যয়। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের স্থলবন্দর দিয়ে পোশাক ও বস্ত্র আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া জাপানে পণ্য পৌঁছাতে ৭৫ থেকে ১১৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। চীনের ক্ষেত্রে সময় লাগে ১৮ থেকে ৩৭ দিন। অন্যদিকে ইরানের বাজারে রয়েছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তাঝুঁকি ও ব্যাংকিং জটিলতা। ব্রাজিলের বাজারে পাট রপ্তানির ক্ষেত্রে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কও বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতাও আছে। চীন ১৮টি বাজারের সবকটিতে বাংলাদেশে প্রতিযোগী। ভিয়েতনাম ১৪টিতে, ভারত ১১টিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী।





