spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

বাংলাদেশি পাটপণ্যে শুল্ক আরও বাড়াল ভারত, আরও শুল্কের পরিকল্পনা

জেড নিউজ, ডেস্ক:

বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটজাত পণ্যের ওপর ভারতের সরকার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরও বাড়িয়েছে। এর ফলে ভারতের স্থানীয় পাটপণ্য উৎপাদকেরা সুরক্ষা পাবেন বলে আশা করা হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি খারাপ খবর। একই সঙ্গে ভারতীয় পাটকলগুলোর পাটপণ্যের চাহিদা এবং উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহারও বাড়তে পারে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু বিজনেসলাইনের খবরে বলা হয়েছে, বর্ধিত শুল্ক ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। ফলে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতীয় পাটশিল্প এর সুফল পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশে পাটপণ্যের চাহিদা বাড়লে ভারতীয় পাটচাষি, শ্রমিক এবং পাটকলগুলোও লাভবান হবে।

ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় এই বাড়তি অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এর আগে ভারতের বাণিজ্য প্রতিকারবিষয়ক অধিদপ্তর ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ (ডিজিটিআর) বিষয়টি নিয়ে একটি মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা করেছিল। ভারত ২০১৭ সালে প্রথমবার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছিল এবং ২০২২ সালে সেটি আরও পাঁচ বছরের জন্য বাড়ানো হয়। কিন্তু পর্যালোচনায় দেখা যায়, পুরোনো শুল্কের কার্যকারিতা অনেকটাই কমে গেছে।

গত চার বছরে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে ভারতে পাটের সুতা, হেসিয়ান কাপড় এবং স্যাকিং বা বস্তা জাতীয় পণ্যের আমদানি প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে ভারতের মোট পাটপণ্য ব্যবহারের প্রতি সাত টনের মধ্যে প্রায় এক টন বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা হয়।

নতুন শুল্কব্যবস্থায় আগের নির্দিষ্ট হার বাতিল করে প্রতিটি রপ্তানিকারক পাটকলের জন্য আলাদা শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। কোন মিল কী দামে পণ্য রপ্তানি করছে, সেই প্রকৃত দামের ভিত্তিতে শুল্কের হার ঠিক করা হয়েছে। আর যেসব রপ্তানিকারক তদন্তে সহযোগিতা করেনি, তাদের জন্য শুল্কের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি রাখা হয়েছে।

ভারতীয় পাটশিল্প এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি সীমান্ত বন্ধ করার পদক্ষেপ নয়। বরং দুই দেশের পাটপণ্যের মধ্যে ন্যায্য প্রতিযোগিতা ফিরিয়ে আনার একটি ব্যবস্থা। ভারতের ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (আইজেএমএ) চেয়ারম্যান রাঘবেন্দ্র গুপ্ত বলেন, ‘সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। এর ফলে ভারতীয় পাটশিল্পে দেশীয় পাটপণ্যের চাহিদা বাড়বে। পাটপণ্যের চাহিদা বাড়লে পাটকলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহারও বাড়বে। এর ফলে কর্মসংস্থানও বাড়বে।’

এদিকে ডিজিটিআর বাংলাদেশ ও নেপালের রপ্তানিকারকরা যে সরকারি ভর্তুকি পান, তা নিয়েও আলাদা একটি তদন্ত শেষ করেছে। এই তদন্তের আবেদন করেছিল ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন। তদন্তে ডিজিটিআর দেখতে পেয়েছে, বাংলাদেশের পাটকলগুলো রপ্তানি করা প্রতিটি চালানের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নগদ প্রণোদনা পেয়ে থাকে। এর পাশাপাশি তারা আয়কর সুবিধাও পায়। নেপালের পাটকলগুলোও একই ধরনের সুবিধা পায়। তাদের জন্য রয়েছে রপ্তানি অনুদান এবং কর-সুবিধা।

এই তদন্তের পর ডিজিটিআর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটপণ্যের ওপর কাউন্টারভেইলিং ডিউটি বা ভর্তুকি-প্রতিসাম্য শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে। এই শুল্কের উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশ ও নেপালের পাটকলগুলো যে সরকারি রপ্তানি ভর্তুকি পায়, তার প্রভাব সমান করে দেওয়া। সোজা কথায় বাংলাদেশি বা নেপালি ব্যবসায়ীরা ভর্তুকি থেকে যে বাড়তি আয় করেন সেই সমপরিমাণ অর্থ ভারত শুল্কের মাধ্যমে আদায় করে নেবে রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে।

ডিজিটিআর-এর তদন্তে বলা হয়েছে, ভর্তুকিপ্রাপ্ত আমদানির কারণে ভারতের স্থানীয় পাটশিল্প গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ও নেপালের ভর্তুকিপ্রাপ্ত পাটপণ্য ভারতীয় পাটকলগুলোর পণ্যের তুলনায় কম দামে বাজারে বিক্রি হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় পাটকলগুলো তাদের পণ্যের দাম কমাতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের উৎপাদন, উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার, বিক্রি এবং মুনাফা কমেছে।

এমনকি অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক চালু থাকার সময়ও এই ক্ষতি অব্যাহত ছিল। ডিজিটিআর বলেছে, ভারতীয় পাটশিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া সরাসরি জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ ভারতের পাটকলগুলোতে প্রায় ৪ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। পাশাপাশি ভারতের কাঁচা পাট উৎপাদনকারী প্রায় ৪০ লাখ কৃষক পরিবার এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তবে কাউন্টারভেইলিং ডিউটি এখনো কার্যকর হয়নি। ডিজিটিআর-এর সুপারিশের পর বিষয়টি এখন ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও প্রজ্ঞাপন জারির অপেক্ষায় রয়েছে।

ভারতের ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান সঞ্জয় কাজারিয়া বলেন, ‘প্রায় এক দশক ধরে এই শিল্প বাণিজ্য প্রতিকার সংক্রান্ত প্রতিটি মামলায় জয় পেয়েছে। তারপরও আমদানি বেড়েছে। কারণ অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক শুধু পণ্যের দামের বিষয়টি ঠিক করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু এর পেছনে থাকা সরকারি ভর্তুকিকে স্পর্শ করেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কাউন্টারভেইলিং ডিউটির তদন্তের মাধ্যমে প্রথমবার ভারত সরকার বাংলাদেশ যে রপ্তানি প্রণোদনা দিচ্ছে, সেটিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। ডিজিটিআর-এর তদন্তের ফলাফলও নিশ্চিত করেছে, পাটকল ও কৃষকরা বহু বছর ধরে যে বিষয়টি বলে আসছেন।’ কাজারিয়ার মতে, নতুন করে নির্ধারিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের সঙ্গে কাউন্টারভেইলিং ডিউটি কার্যকর হলে ২০১৭ সালের পর প্রথমবার ভারতীয় পাটশিল্প একটি ন্যায্য বাজার পাবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা সুরক্ষা চাইছি না। আমরা চাইছি, পাটপণ্য যেন খরচ ও মানের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করে। কোনো দেশের সরকার তার রপ্তানিকারককে কত বড় অঙ্কের অর্থ দিচ্ছে, তার ভিত্তিতে যেন প্রতিযোগিতা নির্ধারিত না হয়।’ অর্থাৎ, ভারতের পাটশিল্পের বক্তব্য হলো, বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে কম দামে পাটপণ্য আসার পেছনে যদি সরকারি ভর্তুকি থাকে, তাহলে শুধু অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সেই ভর্তুকির প্রভাবও শুল্কের মাধ্যমে সমন্বয় করতে হবে। আর সেই লক্ষ্যেই ভারত এখন কাউন্টারভেইলিং ডিউটি আরোপের দিকে এগোচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়