১৮/০৪/২০২৬, ১৭:২০ অপরাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    সেক্যুলার ভারতের পরিচয় বদলে দিচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা

    আমিরুল ইসলাম কাগজী
    ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এখন আর কেবল একটি রাজনৈতিক দলের আদর্শিক অবস্থান নয়; এটি ধীরে ধীরে সমাজ, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তাদের আদর্শিক মাদার অর্গানাইজেশন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সাংগঠনিক অনুশীলনের মাধ্যমে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী থাকুন বা না থাকুন—হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এই উত্থান কোনো ক্রমেই থামানো যাবেনা। আরএসএস ভারতের গোড়া হিন্দু সংগঠন, যে সংগঠনের হাত ধরে বেড়ে উঠেছেন নরেন্দ্র মোদী। সেই সংগঠন এখন বদলে দিচ্ছে ভারতের পরিচয়, লক্ষ্য অসাম্প্রদায়িক ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা।।

    সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিজেপির রাজনৈতিক সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আরএসএস। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি নিজেকে একটি “সাংস্কৃতিক সংগঠন” হিসেবে পরিচয় দিলেও বাস্তবে এটি ভারতের বৃহত্তম আদর্শিক ও ক্যাডারভিত্তিক নেটওয়ার্ক। একশত বছর পরে এসে সেই আরএসএস এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গভীরে ঢুকে এগুলোকে এতটাই নিজেদের প্রভাবলয়ের মধ্যে এনেছে যে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় থেকে বিদায় নিলেও সংগঠনটির প্রভাব থেকে যাবেই। কয়েক দশক ধরে আরএসএস নিয়মিত শাখা (দৈনিক প্রশিক্ষণ শিবির), শারীরিক অনুশীলন, আদর্শিক পাঠ এবং শৃঙ্খলাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ স্বয়ংসেবক তৈরি করেছে। সারা ভারতে আরএসএসের অন্তত ৮৩ হাজার শাখা রয়েছে। পাড়া মহল্লা থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে পর্যন্ত এসব শাখা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। আরএসএস যে ধরনের মানুষদের নিয়ে ভারতের ভবিষ্যৎ যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সেই ছাঁচে তৈরি করার জন্য এই শাখা গুলো কাজ করে। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে তারা মানুষের মধ্যে অভ্যাস তৈরি করে এবং আদর্শ গেঁথে দেয়।শাখাগুলোর মধ্যে ‘সুস্পষ্ট, অনুসরণযোগ্য ও বাস্তব সম্পর্ক’ রয়েছে।

    আরএসএস-এর প্রথম দিকের নেতারা কোন রাগ ঢাক না রেখেই তাদের লড়াইয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন – সেটি হল ভারতের পরিচয় হবে একটাই তাহলো হিন্দু। আরএসএসের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী প্রধান এম এস গোলওয়ালকর মনে করেন, যারা হিন্দু নন তারা কেবল তখনই ভারতে থাকতে পারবেন, যখন তারা হিন্দু জাতির পুরোপুরি অধীনস্থ থাকবেন, কোন দাবি তুলবেন না, কোন সুযোগ প্রত্যাশা করবেন না, এমনকি নাগরিক অধিকার পর্যন্ত দাবি করবেন না।

    ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর কংগ্রেসের নেতৃত্বে একটি সেকু্লার সরকার গঠিত হলেও আরএসএস মেনে নিতে পারেনি। যে কারণে তাদেরই এক কর্মী নাথুরাম গডসের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন স্বাধীনতার অন্যতম নেতা মহাত্মা গান্ধী। তবে সেই ঘটনার পর বিজেপি বেশ চাপের মধ্যেই ছিল। ১৯৭০ এর দশকে মাঝামাঝি সময় আর এস এসকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সেখান থেকে তারা আবার ঘুরে দাঁড়ায়।

    প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মোদি নিজেও আরএসএস থেকে উঠে আসা একজন পূর্ণকালীন প্রচারক ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার নেতৃত্বে বিজেপি যে রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে, তা আরএসএসের দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক প্রস্তুতিরই ফল। তবে নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, মোদি এই ব্যবস্থার একমাত্র কেন্দ্র নন; বরং তিনি একটি বৃহত্তর কাঠামোর অংশ। সেই কাঠামো এমনভাবে বিস্তৃত ও প্রোথিত যে, একজন নেতার বিদায়েও এর গতি থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

    আরএসএস প্রধান মোহন ভগবতের বক্তব্যগুলো এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। বিভিন্ন সময়ে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ভারত মূলত একটি হিন্দু রাষ্ট্র এবং দেশের জাতীয় পরিচয় হিন্দু সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠবে। ভগবতের মতে, ভারতের অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা এই “হিন্দু পরিচয়ের” ভেতরেই নিরাপদ থাকতে পারে, তবে জাতির মূল সুর নির্ধারণ করবে হিন্দুত্ব। এই ধরনের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করে।

    প্রতিবেদনে বিজেপির অন্যান্য নেতাদের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে মুসলিম ও খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের নিয়ে সন্দেহ ও ভয়ের বয়ান বারবার ফিরে এসেছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে “এক দেশ, এক সংস্কৃতি, এক জাতি” ধারণাকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন। এই বক্তব্যগুলোর প্রভাব শুধু নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা প্রশাসন, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আচরণেও প্রতিফলিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

    নিউ ইয়র্ক টাইমস আরও বলছে, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো এটি সমাজের দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিকতা অর্জন করেছে। আগে যেসব বক্তব্য বা আচরণ চরমপন্থী বলে বিবেচিত হতো, এখন সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে মূলধারার অংশ হয়ে গেছে। পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের পুনর্লিখন, মুসলিম শাসকদের ভূমিকা নিয়ে একপেশে উপস্থাপন, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব ও আনুগত্য প্রশ্নবিদ্ধ করা—এসবই এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

    প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলছে, এই প্রবণতা ভারতের বহুত্ববাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানিক কাঠামোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও ভারতীয় সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে, বাস্তবে রাষ্ট্র ও ধর্মের সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিজেপি ও আরএসএসের সমর্থকেরা একে “সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ” হিসেবে দেখলেও সমালোচকদের মতে, এটি সংখ্যালঘু অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

    নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই উত্থান কেবল কেন্দ্রের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। রাজ্য পর্যায়ে বিজেপির বিস্তার, প্রশাসনে আরএসএসপন্থী ব্যক্তিদের প্রভাব এবং সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত আদর্শিক প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে বিজেপি ক্ষমতায় না থাকলেও হিন্দুত্ববাদী চিন্তাধারা রাষ্ট্র পরিচালনার নানা স্তরে প্রভাব রেখে যাবে।

    সব মিলিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদন একটি গভীর বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে—ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এখন ব্যক্তি বা একক নেতৃত্বনির্ভর নয়। এটি একটি সুসংগঠিত, দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক প্রকল্প, যার ভিত্তি বহু দশক আগে নির্মিত হয়েছে। মোদি প্রধানমন্ত্রী থাকুন বা না থাকুন, বিজেপি ও আরএসএসের এই আদর্শিক যাত্রা ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজকে নতুন এক মোড়ে নিয়ে যাচ্ছে—যার প্রভাব শুধু ভারতের ভেতরেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক রাজনীতিতেও সুদূরপ্রসারী হয়ে উঠতে পারে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়