জেড নিউজ , ঢাকা :
আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনকে কল্যাণময় করার জন্য কিছু সময়, স্থান ও আমলকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। মহররম মাস তেমনই এক মহিমান্বিত মাস।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক মানুষ মহররমকে শুধু আশুরার শোক বা কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। অথচ কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই মাস হলো ইবাদত, তওবা, নফল রোজা, দান-সদকা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুবর্ণ সময়।
একজন সচেতন মুমিনের উচিত এই মাসের ফজিলত উপলব্ধি করে নিজের আমলনামা সমৃদ্ধ করা।
১. মহররম মাসের মর্যাদা উপলব্ধি করা
মহররম মাসের গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং এ মাসকে সম্মান করা একজন মুমিনের প্রথম করণীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি; তার মধ্যে চারটি সম্মানিত (হারাম) মাস।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)
মহররম সেই চারটি হারাম মাসের অন্যতম।
তাই এ মাসে পাপ থেকে বিশেষভাবে বেঁচে থাকা এবং নেক আমল বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. আন্তরিক তওবা ও আত্মসমালোচনা করা
হিজরি বছরের সূচনা আত্মসমালোচনা ও নতুনভাবে জীবন গঠনের এক উত্তম সময়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
মহররম মাসে একজন মুমিন বিগত বছরের ভুল-ত্রুটি স্মরণ করে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে তওবা করা এবং নতুন বছরকে নেক আমলের মাধ্যমে শুরু করা জরুরি।
৩. অধিক পরিমাণে নফল রোজা রাখা
রমজানের পর সর্বশ্রেষ্ঠ রোজা হলো মহররম মাসের রোজা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)
তাই এ মাসে যত বেশি সম্ভব নফল রোজা রাখা মুস্তাহাব।
৪. আশুরার রোজা পালন করা
মহররমের ১০ তারিখ ‘আশুরা’ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)
আর ইহুদিদের বিরোধিতা করার জন্য রাসুল (সা.) ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন।
৫. বেশি বেশি নফল ইবাদত ও জিকির করা
মহররম মাসে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ, তাহলিল, তাকবির, দোয়া ও ইস্তিগফার বৃদ্ধি করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫২)
এ মাসে প্রতিদিন কিছু সময় কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর জিকিরে ব্যয় করলে ঈমান মজবুত হয় এবং অন্তর প্রশান্তি লাভ করে।
৬. দান–সদকা ও মানুষের উপকার করা
মহররম মাসে গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করা অত্যন্ত প্রশংসনীয় আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণই অগ্রিম পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১১০)
আর দান-সদকা মানুষের বিপদ দূর করে এবং আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম।
৭. হারাম ও গুনাহের কাজ থেকে দূরে থাকা
হারাম মাসে গুনাহের ভয়াবহতা আরো বেশি। তাই এ মাসে পাপ কাজ, অন্যায়, জুলুম, গীবত, মিথ্যা, অশ্লীলতা ও সকল ধরনের অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সুতরাং তোমরা এসব (সম্মানিত) মাসে নিজেদের প্রতি জুলুম কর না।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, সব সময়ই গুনাহ নিষিদ্ধ; তবে হারাম মাসগুলোতে গুনাহের ভয়াবহতা আরো গুরুতর।
৮. বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করা তার উপর আমল করা
নতুন হিজরি বছরের শুরুতে কোরআনের সাথে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার অঙ্গীকার করা অত্যন্ত উত্তম আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় এই কোরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সরল ও সঠিক।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৯)
মহররম মাসে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরআন তিলাওয়াত, অর্থ অধ্যয়ন এবং জীবনে তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর।
৯. আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলাতুর রাহিম) সুদৃঢ় করা
আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া, সম্পর্কের অবনতি দূর করা এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি ও হায়াতের বরকত কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)
নতুন বছরের শুরুতে আত্মীয়তার সম্পর্ক পুনর্গঠন একটি সুন্দর ও বরকতময় উদ্যোগ হতে পারে।
১০. ইসলামের ইতিহাস ও আশুরার শিক্ষাগুলো অধ্যয়ন করা
মহররম মাস ইসলামের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মারক। বিশেষত আশুরার দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদেরকে ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা রাখার কারণ সম্পর্কে বলেছেন, ‘এটি এমন এক মহান দিন, যেদিন আল্লাহ মুসা ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩০)
এ ছাড়াও মহররম মাসে সংঘটিত কারবালার ঘটনা থেকে ঈমান, সত্যের পক্ষে দৃঢ়তা, ত্যাগ ও ধৈর্যের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।
অতএব, আসুন আমরা মহররম মাসকে গুনাহ, গাফেলতি ও কুসংস্কারে নষ্ট না করে তওবা, নফল রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান-সদকা এবং নেক আমলের মাধ্যমে সার্থক করে তুলি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহররমের বরকতপূর্ণ দিনগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন এবং আমাদের জীবনকে তাকওয়া ও নেক আমলে পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।



