জেড নিউজ ডেস্ক :
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘকাল ধরে জীবাশ্ম নথিতে পাওয়া ডাইনোসরের পায়ের ছাপগুলো কোন নির্দিষ্ট প্রজাতির, তা শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছেন। ডাইনোসরের পায়ের ছাপ অন্যতম সাধারণ জীবাশ্ম হলেও, এগুলো দেখে নির্দিষ্ট প্রজাতির নাম বলা বিজ্ঞানীদের কাছে সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই রহস্যের সমাধান অনেক বেশি নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হচ্ছে। এই নতুন পদ্ধতি বিজ্ঞানীদের প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে বস্তুনিষ্ঠভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করবে। খবর রয়টার্স।
সম্প্রতি বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ এই সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, পায়ের ছাপ শনাক্তের বিষয়টি এখন আর মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করবে না। আধুনিক এআই প্রযুক্তি তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ডাইনোসরের ধরন নির্ণয় করতে সক্ষম হবে।
গবেষকদের মতে, এই নতুন পদ্ধতিতে একটি বিশেষ অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়েছে যা একটি পায়ের ছাপের আটটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে পায়ের সামগ্রিক আকৃতি, আঙুলের বিস্তার, গোড়ালির অবস্থান এবং হাঁটার সময় ডাইনোসরটি কীভাবে তার শরীরের ওজন পায়ের ওপর দিত। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করে এআই খুব সহজেই বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য খুঁজে বের করতে পারে, যা সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়া প্রায় অসম্ভব। জার্মানির হেলমহোল্টজ-জেনট্রাম বার্লিন গবেষণা কেন্দ্রের পদার্থবিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক গ্রেগর হার্টম্যান জানান, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মানুষের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বা ব্যক্তিগত মতামতের ওপর নির্ভরতা অনেক কমে আসবে।
ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গের প্যালিওন্টোলজিস্ট স্টিভ ব্রুসাট বলেন, কোন পায়ের ছাপ কোন ডাইনোসরের, তা খুঁজে বের করা এক বিশাল কাজ এবং বিজ্ঞানীরা প্রজন্ম ধরে এই বিষয় নিয়ে বিতর্ক করে আসছেন। একটি জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া পায়ের ছাপ দেখে সেটি কোন ডাইনোসরের ছিল, তা বের করা মোটেও সহজ কাজ নয়। এর পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যেমন—একই ডাইনোসর যদি দৌড়ায়, লাফ দেয় বা সাঁতার কাটে, তবে তার পায়ের ছাপ ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির হতে পারে। আবার মাটির আর্দ্রতা এবং লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে এই ছাপগুলোর আকৃতি বদলে যায়।
ডাইনোসরের পায়ের ছাপের আকারেও রয়েছে বিশাল বৈচিত্র্য। যেহেতু একটি কঙ্কালের শেষে পায়ের ছাপ পাওয়া যাওয়ার ঘটনা পৃথিবীতে খুবই বিরল, ফলে ডাইনোসরের পায়ের হাড়ের কাঠামোর সঙ্গে মাটির ছাপ মিলিয়ে দেখতে বিজ্ঞানীদের অনেকটা গোয়েন্দার মতোই কাজ করতে হয়।
এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাওয়া ২১ কোটি বছরের পুরোনো কিছু পায়ের ছাপ বিশ্লেষণ করে চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা গেছে, তিন আঙুলের ছোট পায়ের ছাপগুলো বর্তমানের পাখির পায়ের ছাপের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। এটি বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত আশ্চর্যজনক একটি বিষয়, কারণ এই ছাপগুলো বর্তমানের পরিচিত প্রাচীনতম পাখির জীবাশ্মের চেয়েও প্রায় ৬ কোটি বছর আগের। এর মানে হলো, পাখিদের পূর্বপুরুষরা হয়তো আমরা যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়েও অনেক আগে পৃথিবীতে বিচরণ করত। এই আবিষ্কারটি ডাইনোসর থেকে পাখির বিবর্তনের ইতিহাস বুঝতে নতুন পথ দেখাচ্ছে।
ডাইনোসরের হাড়, দাঁত বা নখ খুঁজে পাওয়া কঠিন হলেও তাদের পায়ের ছাপ প্রকৃতিতে অনেক বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। এই ছাপগুলো বিশ্লেষণ করে প্রাচীন পৃথিবী এবং ডাইনোসরের জীবনযাত্রা সম্পর্কে আরো স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া সম্ভব। এই নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে থাকা হাজার হাজার ডাইনোসরের পায়ের ছাপ পুনরায় পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করছেন গবেষকরা। এর ফলে প্রাগৈতিহাসিক যুগে ডাইনোসররা কীভাবে চলত বা পরিবেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেমন ছিল, তা আরো পরিষ্কারভাবে জানা যাবে।



