জেড নিউজ, ঢাকা:
দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও বৃহত্তম আর্থিক কেলেঙ্কারি ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি’ মামলার তদন্তে বড় অগ্রগতি হয়েছে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিবিড় তদন্তের পর অবশেষে দেড়শ পৃষ্ঠার একটি খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রস্তুত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি আইনি পরামর্শের জন্য এই খসড়া অভিযোগপত্রটি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে ।
খসড়া এই অভিযোগপত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে আতিউর রহমান ছাড়াও বাংলাদেশের আরও ৯ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও নাগরিক রয়েছেন । চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে এবং তিনি বর্তমানে পলাতক ।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম শাখার অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এই মামলার তদন্তভার পরিচালনা করছেন । তিনি গণমাধ্যমকে জানান, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় আইনি মতামত ও সবুজ সংকেত পেলেই আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে ।
প্রস্তুতকৃত খসড়া তালিকায় বাংলাদেশি অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম,সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা,সাবেক নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক,মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামান, উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা।
এছাড়া কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, রেজাউল করিম ও মো. সুলতান মাসুদ আহমেদ নামের আরও তিন বাংলাদেশির নাম অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও এখন পর্যন্ত তাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি ।
তদন্তে দেখা গেছে, এই আন্তর্জাতিক চুরির নেপথ্যে কাজ করেছে একটি সুবিন্যস্ত বিদেশি চক্র । অভিযুক্তদের মধ্যে ভারতের নাগরিক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন আইটি উপদেষ্টা রাকেশ আস্থানার নাম উল্লেখযোগ্য। অভিযোগ রয়েছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর রাকেশ আস্থানাকে প্রধান করেই একটি ফরেনসিক অডিট কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং ওই অডিটের আড়ালে ডিজিটাল আলামতের একটি বড় অংশ মুছে ফেলার অপচেষ্টা করা হয় । হ্যাকিং, অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) ও চুরির অপরাধে আরও চার ভারতীয় নাগরিক—প্রীতম রেড্ডি, সুধীন্দ্র আথ্রেশ, নীলভান্নান ও মাদুক্কুর আনন্দনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে ।
এছাড়া আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী হিসেবে পরিচিত উত্তর কোরিয়ার কুখ্যাত হ্যাকার দল ‘ল্যাজারাস গ্রুপ’ ও এর সদস্য পার্ক জিন হিয়োকসহ উত্তর কোরিয়ার দুটি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয়েছে । তালিকায় গাও শুহুয়াসহ দুজন চীনা নাগরিক এবং জাপানের সাসাকি নামের এক ব্যক্তির নামও রয়েছে । চুরি হওয়া অর্থের একটি বড় অংশ পাচার হয়েছিল শ্রীলঙ্কায়, যার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় দেশটির হেগোডা গামাগে শ্যালিকা পেরেরাসহ আট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চার্জশিটে আসামি করা হয়েছে । ক্যাসিনো ব্যবসার আড়ালে অর্থ লোপাটের দায়ে ফিলিপাইনের ‘সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো’ ও কাম সিন অংসহ আরও ৩৬ বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে সিআইডি ।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে সুইফট পেমেন্ট সিস্টেমে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে ১০১ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেয় হ্যাকাররা । পরবর্তীতে মাত্র ৩৪.৬ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো ৬৬.৪ মিলিয়ন ডলার রাষ্ট্রীয় অর্থ উদ্ধার করা যায়নি । ঘটনার ৩৯ দিন পর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা এই মামলার তদন্ত শেষ করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত বছরের ১১ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে প্রধান করে একটি বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করেছিল । এই কমিটির অন্যতম সদস্য এবং প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছিলেন । কিন্তু তদন্তে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নাম আসায় তাকে সে সময় নানা হুমকি-ধমকি দেওয়া হয় এবং ১০ বাংলাদেশির নাম বাদ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। পরে তাকে তদন্ত থেকে সরিয়ে দিয়ে পুরো মামলাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার একটি অশুভ চেষ্টা করা হয় ।
বিশেষ পর্যালোচনা কমিটির নিবিড় তত্ত্বাবধানে অবশেষে সব অপরাধীকে চিহ্নিত করে খসড়া অভিযোগপত্রটি চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়েছে । বর্তমান সরকার এই অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে দেশের ইতিহাসে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।



