১৭/০৬/২০২৬, ১৬:৪৪ অপরাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    বিশ্বকাপের সময় অফিসে উৎপাদনশীলতা কেন কমে যায়?

    জেড নিউজ, ঢাকা:

    বিশ্বকাপ শুরু মানেই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবনে এক অন্যরকম উন্মাদনা। কেউ প্রিয় দলের জার্সি পরে অফিসে যান, কেউ দুপুরের বিরতিতে ম্যাচের বিশ্লেষণ দেখেন, আবার কেউ রাত জেগে খেলা দেখে সকালে চোখে ঘুম নিয়েই কর্মস্থলে হাজির হন।

    ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ শুধু স্টেডিয়াম বা টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কর্মজীবনের দৈনন্দিন ছন্দেও। বিশ্বকাপের সময় অনেক প্রতিষ্ঠানই একটি সাধারণ সমস্যার মুখোমুখি হয়-কর্মীদের উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া।

    কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়? মানুষ কি হঠাৎ কাজ ভুলে যায়? নাকি এর পেছনে রয়েছে মনস্তত্ত্ব, আবেগ এবং সামাজিক আচরণের জটিল সম্পর্ক?

    রাত জাগার প্রভাব পড়ে সকালেই

    বিশ্বকাপের অনেক ম্যাচই বাংলাদেশের সময় গভীর রাতে অনুষ্ঠিত হয়। প্রিয় দলের খেলা মিস করতে চান না বলেই অনেক কর্মী রাত জেগে ম্যাচ দেখেন। ফলাফল ঘুমের ঘাটতি। পরদিন অফিসে গিয়ে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কাজ করতে বসেও বারবার হাই ওঠে, সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে বেশি, আর ছোটখাটো ভুলের সংখ্যাও বেড়ে যায়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যায়, যা সরাসরি উৎপাদনশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে।

    শরীর অফিসে, মন মাঠে

    বিশ্বকাপের সময় অনেক কর্মী শারীরিকভাবে অফিসে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে থাকেন স্টেডিয়ামে। একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ সামনে থাকলে বা আগের রাতের নাটকীয় ফলাফল নিয়ে আলোচনা চললে কাজের চেয়ে ফুটবলই বেশি মনোযোগ কাড়ে। ফাইলের দিকে চোখ থাকলেও মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে গোল, পেনাল্টি কিংবা পরবর্তী ম্যাচের সম্ভাবনা। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় ‘আবেগীয় বিভ্রান্তি’। যখন কোনো বিষয় মানুষের আবেগকে গভীরভাবে স্পর্শ করে, তখন সেটি মনোযোগের বড় একটি অংশ দখল করে নেয়।

    অফিসে শুরু হয় নতুন আড্ডা

    বিশ্বকাপের সময়ে অফিসের করিডোর, ক্যান্টিন কিংবা চায়ের টেবিলগুলো যেন ক্ষুদ্র ফুটবল বিশ্লেষণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।কে ভালো খেলেছে, কোন দল এগিয়ে, কোন খেলোয়াড় সেরা-এসব নিয়ে আলোচনা চলতেই থাকে। সাধারণ সময়ে পাঁচ মিনিটের চা-বিরতি কখনও কখনও আধা ঘণ্টার ফুটবল বিতর্কে রূপ নেয়। এই সামাজিক মিথস্ক্রিয়াগুলো কর্মীদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তুললেও কাজের সময়ের একটি অংশ যে এতে ব্যয় হয়, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই।

    সোশ্যাল মিডিয়ার ফাঁদ

    একসময় মানুষ শুধু টেলিভিশনে খেলা দেখত। এখন খেলা শেষ হলেও আলোচনা শেষ হয় না। ফেসবুক, এক্স, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব কিংবা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ম্যাচ-পরবর্তী বিশ্লেষণ, মিম, ট্রল এবং প্রতিক্রিয়ার বন্যা বয়ে যায়। অফিসে কাজ করতে করতেই অনেকে বারবার ফোন হাতে তুলে নেন।

    একটি পোস্ট দেখতে গিয়ে কখন যে ১৫ মিনিট কেটে যায়, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না। এই ছোট ছোট মনোযোগ বিচ্যুতিগুলো দিনের শেষে বড় ধরনের উৎপাদনশীলতা হ্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

    জয়-পরাজয়ও প্রভাব ফেলে কাজে

    প্রিয় দল জিতলে অনেকের মন ভালো থাকে, কাজেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিন্তু দল হারলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। কিছু মানুষ হতাশ, বিরক্ত বা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন। বিশেষ করে নাটকীয়ভাবে হেরে গেলে বা প্রিয় খেলোয়াড় খারাপ খেললে সেই আবেগ দিনের বেশ কিছু সময় ধরে স্থায়ী হতে পারে। যদিও এটি সাময়িক, তবু আবেগের ওঠানামা কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ এবং উদ্যমকে প্রভাবিত করতে পারে। ফুটবল

    শুধু খেলা নয়, সামাজিক উৎসবও

    বিশ্বকাপের সময় উৎপাদনশীলতা কমার আরেকটি কারণ হলো এটি কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সামাজিক উৎসব। মানুষ একসঙ্গে খেলা দেখে, আলোচনা করে, আনন্দ ভাগাভাগি করে। অফিসের সহকর্মীদের মধ্যে নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হয়, পুরোনো সম্পর্ক আরও গভীর হয়। অর্থাৎ কিছু কাজের সময় কমে গেলেও সামাজিক সংযোগের মাত্রা বেড়ে যায়।

    উৎপাদনশীলতা কমলেও সবটাই কি নেতিবাচক?

    মজার বিষয় হলো, অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন বিশ্বকাপের সময় সাময়িকভাবে উৎপাদনশীলতা কমলেও এর কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। একসঙ্গে খেলা নিয়ে আলোচনা কর্মীদের মধ্যে দলগত সম্পর্ক উন্নত করতে পারে। বিভিন্ন বিভাগের কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ে, কর্মক্ষেত্র আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং মানসিক চাপ কিছুটা কমে।

    অর্থাৎ বিশ্বকাপ কখনও কখনও কর্মক্ষেত্রে এক ধরনের সামাজিক বন্ধনও তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

    বিশ্বকাপের সময় অফিসে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার পেছনে অলসতা নয়, বরং কাজ করে মানুষের আবেগ, উত্তেজনা, ঘুমের অভাব এবং সামাজিক সম্পৃক্ততা। ফুটবল এমন এক খেলা, যা মানুষকে শুধু দর্শক বানায় না; তাকে আবেগের অংশীদারও বানিয়ে ফেলে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়