১৯/০৪/২০২৬, ৬:১১ পূর্বাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    রামনারায়ণ বাঘেল : বাংলাদেশী ট্যাগ লাগালে হত্যা জায়েজ

    আমিরুল ইসলাম কাগজী

    ভারতের তথাকথিত বৃহত্তম গণতন্ত্রের বুকে ক্রমেই গভীর হচ্ছে এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি—গণপিটুনি, সন্দেহভিত্তিক হত্যা এবং পরিচয়ের রাজনীতি। এই ভয়াবহ প্রবণতার সর্বশেষ শিকার ছত্তিশগড়ের বাসিন্দা রামনারায়ণ বাঘেল। তাকে ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ভারতে কি তাহলে‘বাংলাদেশি’ শব্দটি এখন হত্যা বৈধ করার একটি লাইসেন্সে পরিণত হয়েছে?

    রামনারায়ণ বাঘেল আসলে কে ছিলেন?
    রামনারায়ণ বাঘেল ছিলেন ভারতের ছত্তিশগড়ের দরিদ্র সতনামী সম্প্রদায়ের শ্রমিক। কাজের খোঁজে কেরালা রাজ্যের পালাক্কাডে যান মাত্র কয়েকদিন আগে। দুই ছেলে, স্ত্রী ও মায়ের একমাত্র ভরসা ছিলেন তিনি। কয়েক বছর বাইরে শ্রমিকের কাজ করে সামান্য সঞ্চিত অর্থ দিয়ে গ্রামের বাড়ি নির্মাণ করছিলেন—যা এখন অপূর্ণ স্বপ্ন হয়ে রইল। রাম নারায়ণ বাঘেল একজন সাধারণ নাগরিক। কোনো অপরাধী ছিলেন না, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না—বরং ছিলেন দরিদ্র, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি। দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহের জন্য শ্রমনির্ভর কাজ করতেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ‘অপরাধ’ ছিল—তিনি দেখতে সংখ্যালঘুদের মতো, কথা বলতেন ভিন্ন উচ্চারণের, এবং রাজনৈতিক উসকানিতে আক্রান্ত একটি সমাজে তিনি সহজেই ‘অন্য’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার মতো একজন মানুষ।

    স্থানীয় সূত্র ও গণমাধ্যমের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি উগ্র জনতা তাঁকে সন্দেহভাজন ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে মারধর শুরু করে। পরবর্তীতে সেই মারধরই রূপ নেয় নৃশংস হত্যাকাণ্ডে। নিহত হওয়ার পর জানা যায়—রামনারায়ণ বাঘেল ছিলেন একজন ভারতীয় নাগরিক।

    যা ঘটেছিল সেদিন:
    স্থানীয় যুবকদের একটি দল তাকে ঘিরে ধরে। অভিযোগ “বাংলাদেশি” ভেবে
    তাকে লাঠি, পাইপ, কাঠ ও অন্যান্য জিনিস দিয়ে বেদম মারধর করা হয়। ভাই শশীকান্তের ভাষায়, ভিডিওতে স্পষ্ট শোনা যায় “বাংলাদেশি… বাংলাদেশি…” বলে চিৎকার।মারধরের পর অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ভারতের ভেতরে বাংলাদেশি পরিচয়ের ওপর হিংসা এখন ‘সিস্টেমিক’ হয়ে গেছে।

    যেকোনো অপরিচিত, দরিদ্র, মাইগ্র্যান্ট শ্রমিক—তাকে শুধু “বাংলাদেশি” বললেই জনতার সামনে অবমাননা, অপমান, নির্যাতন বৈধ হয়ে যাচ্ছে।রাজনৈতিক দলগুলোও এই বিদ্বেষকে ব্যবহার করছে, সিপিআইএম-বিজেপি-কংগ্রেস-সবাই রাজনৈতিক পয়েন্ট তুলছে। কিন্তু যে শব্দটি হত্যার ট্রিগার ছিল “বাংলাদেশি” সেটি নিয়ে কেউ সরাসরি কথা বলতে চায় না।

    কেন তাকে হত্যা করা হলো:
    এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নয়, বরং কাজ করেছে পরিচয়ভিত্তিক ঘৃণা ও রাষ্ট্রীয় নীরব প্রশ্রয়। ‘বাংলাদেশি’ শব্দটি এখানে কোনো নাগরিকত্ব যাচাইয়ের টার্ম নয়, বরং একটি রাজনৈতিক অপবাদ, যা ব্যবহার করে কাউকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত এবং শেষ পর্যন্ত হত্যা করা হচ্ছে।

    ভারতে দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিম, দলিত, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’, ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘জিহাদি’—এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে জনমত গঠন করা হচ্ছে। এই ভাষাগত সহিংসতাই ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে শারীরিক সহিংসতায়।রামনারায়ণ বাঘেল হত্যাকাণ্ড সেই ধারাবাহিকতারই একটি করুণ উদাহরণ।

    ‘বাংলাদেশি’ ট্যাগ: একটি নতুন অস্ত্র
    আজকের ভারতে ‘বাংলাদেশি’ শব্দটি আর কেবল একটি ভৌগোলিক পরিচয় নয়। এটি এক ধরনের ডিহিউম্যানাইজিং ট্যাগ—যার মাধ্যমে কাউকে মানুষ হিসেবে না দেখে শত্রু, অনুপ্রবেশকারী কিংবা রাষ্ট্রের বোঝা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
    এই ট্যাগ লাগালেই—
    আইনের শাসন অকার্যকর হয়ে যায়
    গণপিটুনি ‘দেশপ্রেম’ হিসেবে বৈধতা পায়
    হত্যাকারীরা সমাজে প্রশ্রয় পায়
    রাষ্ট্র নির্বিকার দর্শকে পরিণত হয়
    রামনারায়ণ বাঘেলকে হত্যার আগে কেউ তার পরিচয়পত্র দেখতে চায়নি, কেউ প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়নি। কারণ ‘বাংলাদেশি’ তকমা লাগানো মানেই তাকে হত্যা করা যেন সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
    এটি কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা?
    একেবারেই না। বিগত কয়েক বছরে ভারতে বহু মানুষকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়েছে—
    গরু বহনের অভিযোগে
    মাংস রাখার সন্দেহে
    উর্দু বা বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে
    কিংবা শুধুই চেহারার কারণে
    প্রতিটি ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মিল—ঘৃণার রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের নীরবতা।
    রামনারায়ণ বাঘেল সেই দীর্ঘ তালিকার আরেকটি নাম, যে তালিকায় ন্যায়বিচার খুব কমই এসেছে।

    রাষ্ট্র ও প্রশাসনের ভূমিকা:
    সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের পর প্রশাসনের ভূমিকা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়
    হত্যাকে ‘গণপিটুনির দুর্ঘটনা’ বলা হয়,নিহত ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়,অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয় না,মামলাগুলো দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে যায়,এই কাঠামোগত ব্যর্থতাই উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে আরও সাহসী

    করে তুলছে।মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:
    রামনারায়ণ বাঘেল হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বলে দাবি উঠেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন সংস্থা আগেও ভারতে সংখ্যালঘু নিপীড়ন ও গণপিটুনি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।কিন্তু বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রেই এর প্রতিফলন দেখা যায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে।

    বাংলাদেশকে জড়িয়ে ঘৃণার রাজনীতি:
    এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই ঘৃণার রাজনীতিতে বারবার বাংলাদেশকে টেনে আনা। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তত্ত্ব ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে শুধু ভারতের সংখ্যালঘুরাই নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কও অনাকাঙ্ক্ষিত চাপের মুখে পড়ছে।বাস্তবে বহু হত্যাকাণ্ডে নিহতরা ভারতীয় নাগরিক—যেমন রামনারায়ণ বাঘেল। কিন্তু ‘বাংলাদেশি’ তকমা লাগানোর পর সেই সত্য আর গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।

    রামনারায়ণ বাঘেল ছিলেন একজন মানুষ—কোনো সংখ্যা নন, কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার নন। তাকে হত্যা করা হয়েছে একটি শব্দের কারণে, একটি পরিচয়ের কারণে, একটি মিথ্যা ধারণার কারণে।আজ যদি ‘বাংলাদেশি’ ট্যাগ লাগিয়ে কাউকে হত্যা করা যায়, তবে কাল অন্য কোনো পরিচয়কে সামনে রেখে আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটবে। এই চক্র থামাতে না পারলে ভারতের গণতন্ত্র শুধু নামেই থাকবে, বাস্তবে নয়।
    রামনারায়ণ বাঘেলের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
    যেখানে পরিচয়ই অপরাধ, সেখানে কেউই নিরাপদ নয়।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়