১৬/০৪/২০২৬, ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    ঐতিহ্যবাহী চাকা শিল্প বিলুপ্তির পথে

    ওকি গাড়িয়াল ভাই, কত রব আমি পন্থের দিকে চাইয়া রে, যেদিন গাড়িয়াল উজান যায়, নারীর মন মর ছুইরা রয় রে .., ওকি গাড়িয়াল ভাই…
    হাঁকাও গাড়ি তুই চিল মারির বন্দরে রে – এই মরমী কণ্ঠের গান আর শোনা যায় না।
    কালের পরিক্রমায় ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিখ্যাত নাটোরের লালপুরের ঐতিহ্যবাহী চাকা শিল্প বিলুপ্তির পথে। উপজেলার গৌরীপুর ও পালিদেহাসহ আড়মবাড়ীয়া গ্রামের হাতুড়ী ও বাটালের খট খট শব্দে ও ক্রেতাদের আনাগোনায় মুখরিত হয়ে থাকতো এই চাকা শিল্প এলাকা। এখন তেমন শব্দ পাওয়া যায় না। আর ক্রেতাদের আনাগোনা চোখে পড়ে না। নিপুণ হাতে তাদের প্রস্তুতকৃত তৈরি চাকার কদর ছিল দেশজুড়ে। আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য বহন করত গরু ও মহিষের গাড়ি।
    এসব পরিবহনে ব্যবহার করত কাঠের তৈরি চাকা। সে সময় প্রধান যানবাহন ছিল গরু ও মহিষসহ ঘোড়ার গাড়ি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ও কালের পরিক্রমায় গরু ও মহিষের গাড়ি কমে যাচ্ছে। আর ঘোড়ার গাড়ি এখন তো চোখেই পড়ে না। ইঞ্জিনচালিত পাওয়ার টলি, আলম সাধু, নছিমন, করিমন ও মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন প্রকার যানবাহন বাজার দখল করে রেখেছে। কৃষি কাজ, মালামাল বহনসহ বিয়েতে এসব পরিবহন ব্যবহৃত হচ্ছে। এ সকল পরিবহনে ব্যবহৃত হয় টায়ারের চাকা। আধুনিক এসব পরিবহনের কারণে গরু ও মহিষের গাড়ির চাহিদা দিন দিন কমে যাওয়ার কারণে বিলুপ্তির পথে কাঠের তৈরি চাকা।
    লালপুরের তৈরি চাকার কদর ছিল দেশজুড়ে। যেমন পাঁচবিবি, নওগাঁ, নাটোর, বগুড়া, পাবনা, ভৈরব, গাজীপুর, কাপাশিয়া, কিশোরগঞ্জ, অষ্টগ্রাম ও রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে। চাহিদা মেটাতে মার্কেটে চাকা সরবরাহ করতে রীতিমতো হিমশিম খেতেন চাকা ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে চাকা শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। আর চাকা তৈরির কারিগরসহ ব্যবসায়ীরা হতাশার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছে। পেটের তাগিদে এবং সংসারের হাল ধরতে বাপ-দাদাদের নিজ পেশা ছেড়ে জীবিকার জন্য অনেকেই ভিন্ন পেশায় চলে গেছেন। সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা লালপুরের গৌরীপুর ও পালিদেহাসহ আড়বাড়ীয়া এলাকায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগেও ৫শ’ কারখানায় প্রায় ৫ হাজার কারিগর চাকা তৈরির কাজ করতেন। এর মধ্যে এখন মাত্র ৩টি কারখানায় চাকা তৈরি হচ্ছে।
    আধুনিকতার ছোঁয়ায় ও কালের পরিক্রমায় উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, চাহিদার হ্রাস ও তৈরি চাকার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী লালপুরের চাকা শিল্প দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। চাকা তৈরি করে ভালো মুনাফা না হওয়ায় জীবন-জীবিকার তাগিদে ব্যবসায়ীসহ কারিগররা বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পুরানো পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছেন। পাওয়ার টলি, আলম সাধু, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন প্রকারের আধুনিক পরিবহন আশায় গরু ও মহিষের গাড়ি কমে যাওয়ার কারণে ব্যাপক চাহিদার হঠাৎ করেই বাজারে চাকার ব্যবসায় ধস নেমে আসে। বর্তমানে হাতেম ও শ্রী অরুণ কুমার সরকারসহ এমদাদুল হক ইনুর চাকা তৈরির কারখানায় কারিগরদের চাকা তৈরির কাজ করতে দেখা গেছে।
    আর সাইফুল মালিথা, হুজুর আলী, দুলালসহ বেশিরভাগ চাকা ব্যবসায়ীদের চাকা তৈরির কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কাঠের উচ্চ মূল্যসহ উৎপাদন খরচ বেশি। সেই তুলনায় চাকার দাম কম হওয়ায় ও বাজারে চাহিদা না থাকায় তারা এই পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় চলে গেছে। অনেকেই কাঠের ব্যবসা ও ভ্যান চালিয়ে দিনমজুরির কাজ করে জীবিকা অর্জন করছেন। এ বিষয়ে চাকা ব্যবসায়ী এমদাদুল হক ইনু বলেন, চাকার কদর থাকায় আমার কারখানার তৈরি চাকা বিক্রয়ের জন্য ট্রাকে করে বগুড়ায় পাঠাতাম। এখন আর আগের মতো চাকার কদর নাই। এ ছাড়া কাঠের মূল্য বেশি হওয়ায় এবং পাওয়ার টলিসহ বিভিন্ন যানবাহনের জন্য গরু-মহিষের গাড়ি কমে যাওয়ার কারণে চাকা কিনতে তেমন কেউ আসে না। এই এলাকায় সুগার মিল চলাকালীন কিছু লোক চাকা নিতে আসেন। তাও সঠিক মূল্য পাওয়া যায় না।
    এ বিষয়ে চাকা ব্যবসায়ী অরুণ কুমার সরকার বলেন, এক জোড়া চাকা তৈরি করতে প্রায় ৯ হাজার টাকা লেগে যায়। আর বিক্রি হয় প্রায় ১১ হাজার টাকায়। কয়েক জোড়া চাকা কারিগর দিয়ে তৈরি করে রেখেছি তাও এখনো বিক্রি হয়নি। এ বিষয়ে হুজুর আলী নামের এক চাকা ব্যবসায়ী বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে চাকার ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছি। বর্তমানে নিজের জমিতে কৃষি কাজ করি। আর আমার সঙ্গে দুলাল নামের একজন চাকা ব্যবসা বাদ দিয়ে ঢাকায় চলে গেছে। এ বিষয়ে চাকা তৈরির কারিগর শ্রী সমর সরকার বলেন, আমরা চাকা তৈরি করে ৫শ’ টাকা মজুরি পাই। কিন্ত চাকা তৈরি করতে কঠোর পরিশ্রম করা লাগে। এ বিষয়ে বাওড়া গ্রামের মহিষের গাড়োয়ান বাচ্চু বলেন, এক জোড়া চাকা কিনলে প্রায় দুই বছর চলে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়