জেড নিউজ, ঢাকা:
শিশু ও কিশোরদের মধ্যে স্মার্টফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ভিডিও দেখা, গেম খেলা, সামাজিক মাধ্যমে সময় কাটানো বা বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাট করা-সব মিলিয়ে স্ক্রিন এখন তাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রযুক্তি যেমন শেখার ও বিনোদনের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি এর অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগও বাড়ছে। তাই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ-কখন এই স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ক্রিন টাইম নিয়ে শুধু সময়ের হিসাব করা যথেষ্ট নয়; বরং শিশুটি কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে স্ক্রিন ব্যবহার করছে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি এটি তার পড়াশোনা, ঘুম, শারীরিক খেলাধুলা কিংবা সামাজিক মেলামেশাকে বাধাগ্রস্ত করতে শুরু করে, তখনই বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সব ধরনের স্ক্রিন ব্যবহারই যে ক্ষতিকর, তা নয়। শিক্ষামূলক কনটেন্ট দেখা, নতুন কিছু শেখা, সৃজনশীল কাজে অংশ নেওয়া বা পরিবার-বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা অনেক সময় ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা শিশুর বাস্তব জীবনের কার্যক্রমকে ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয়।
অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের একটি বড় প্রভাব পড়ে মনোযোগ ও একাগ্রতার ওপর। দ্রুত পরিবর্তনশীল ছোট ছোট ভিডিও বা কনটেন্টে অভ্যস্ত হয়ে গেলে শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা বা অন্য কাজ করতে সমস্যায় পড়ে। এতে তাদের শেখার গতি ও একাডেমিক পারফরম্যান্সও প্রভাবিত হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকেও দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অনেক শিশু স্ক্রিন থেকে দূরে রাখলে বিরক্তি, রাগ বা হতাশা প্রকাশ করে। কিশোরদের ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো নিজেদের অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা বাড়ায়, যা আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিতে পারে এবং উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
ঘুমের সমস্যাও একটি সাধারণ প্রভাব। রাতে দীর্ঘ সময় ফোন বা ট্যাব ব্যবহার করলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়। ফলে শিশুর পর্যাপ্ত বিশ্রাম হয় না, যা তার মেজাজ, শক্তি, মনোযোগ এবং সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এছাড়া অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেও দূরে সরিয়ে দিতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, বাইরে খেলা বা পারিবারিক সময় কাটানো-এসব অভিজ্ঞতা তাদের সামাজিক দক্ষতা, সহানুভূতি, আত্মবিশ্বাস এবং আবেগগত বুদ্ধিমত্তা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অভিভাবকদের উচিত কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণের দিকে খেয়াল রাখা, যা ইঙ্গিত দিতে পারে যে শিশুর স্ক্রিন ব্যবহার অতিরিক্ত হয়ে গেছে। যেমন-ডিভাইস ছাড়া থাকতে না চাওয়া, আগের শখে আগ্রহ হারানো, ঘুমের সমস্যা, পড়াশোনায় অবনতি, সামাজিকভাবে দূরে সরে যাওয়া বা আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন।
এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্ক্রিন পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং একটি ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি। পরিবারের সবাই মিলে খাবারের সময় বা ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার না করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। বাইরে খেলাধুলা, বই পড়া বা সৃজনশীল কাজে শিশুদের উৎসাহ দেওয়া উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অভিভাবকরাই যেন নিজের আচরণের মাধ্যমে একটি স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল অভ্যাসের উদাহরণ তৈরি করেন।



