ইবি প্রতিনিধি:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আবাসিক হলগুলোতে নেই অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র। হয় না কোনো অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি বহির্গমন মহড়া। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিকটবর্তী দুই ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দূরত্ব যথাক্রমে ২২ ও ২৪ কিলোমিটার। এতে হঠাৎ আগুন লাগলে তাৎক্ষনিক কোনো ব্যবস্থা নিতে না পারায় দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে জিনিসপত্রের ক্ষয়ক্ষতি ও জীবননাশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে আগুন নিয়ন্ত্রনের অভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে অনাকাঙ্খিত দূর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। এ অবস্থায় অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষক-শিক্ষার্থী। এরআগে ছাত্রী হলে কয়েক দফায় আগুন লাগলে একাধিকবার ছাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে প্যানিক এ্যাটাকের ঘটনা ঘটেছে। এরপর ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ন স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন করে দায় সেরে আর কোনো খোঁজ রাখেনি কর্তৃপক্ষ। পরে তদারকি না থাকায় সবগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো ধরনের হেলদোল নেই বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। তবে আগামী সপ্তাহের মধ্যে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বসানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আটটি আবাসিক হলের মধ্যে মাত্র একটি হলে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রয়েছে। বাকি সাতটি হলের কোনোটিতেই আগুন নেভানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। এসব হলগুলোতে খাবারের মান ভালো না হওয়ায় অধিকাংশ কক্ষে শিক্ষার্থীরা বৈদ্যুতিক হিটার ব্যবহার করে রান্না করেন। এতে শর্টসার্কিটের মাধ্যমে কিংবা অসাবধানতায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা রয়েছে। গত বছরের ৭ জুলাই থেকে ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মোট পাঁচবার বিশ্ববিদ্যালয়ের খালেদা জিয়া হলে আগুন লাগলে ছাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে রুমের বাইরে বেরিয়ে আসে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক-প্রশাসনিক ভবন, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবনসহ ছোট-বড় অর্ধশতাধিক ভবনে অবস্থিত বিভাগগুলোতে এসি ও শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় হিটার, টিভি, রেফ্রিজারেটরসহ নানা বৈদ্যুতিক সামগ্রী ও গ্যাস সিলিন্ডার ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। তবে এসব ভবনের হাতেগোনা তিন-চারটিতে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেও বাকিগুলোতে নেই বলে জানিয়েছে এস্টেট অফিস।
এছাড়া বিভিন্ন একাডেমিক ভবনে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেও ৮ মাস আগেই মেয়াদ শেষ হয়েছে। এদিকে টিএসসিসিতে স্থাপিত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মেয়াদ শেষ ১৭ মাস আগেই। দীর্ঘ এ সময় পেরোলেও এগুলো পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। তাদের গাছাড়া ভাবে সকলের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ল্যাবে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন বিভাগের গবেষণাগারে দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়। একটু অসতর্ক হলেই, মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এখানে প্রায় সময়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে। তবে গবেষণাগারে আগুন নেভানোর কোনো ব্যবস্থা নেই, এমনকি এ বিষয়ে তাদের কোনো প্রশিক্ষণও নেই। শিক্ষার্থীরা জানান, আটটি হলে প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থী বসবাস করেন। এছাড়া একাডেমিক ভবনগুলো প্রতিনিয়ত ক্লাস করে হাজারো শিক্ষার্থী। সেখানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার এমন অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ এসব অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র পরিবর্তন করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উম্মুল মুমিনীন আয়েশা ছিদ্দীকা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী জেরিন তাসমিন বলেন, ‘আমাদের হলে আগুন লাগলে তা নেভানোর জন্য কোনো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা বা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নেই। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রশাসনের প্রত্যেকটি হল ও একাডেমিক ভবনসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন করা উচিত।’
সাদ্দাম হোসেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মোবারক বলেন, ‘ছেলেদের হলগুলোতে আগুন নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই। হঠাৎ আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে শিক্ষার্থীরা অনাকাঙ্খিত ক্ষতির মধ্যে পড়তে পারে। এজন্য শিক্ষার্থীদের নিরাপদ জীবনযাপন নিশ্চিতে প্রশাসনের এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
এ বিষয়ে প্রভোস্ট কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক ড. আব্দুল গফুর গাজী বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকটি হলে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপনের বিষয়ে প্রভোস্টদের নির্দেশনা দেবো।’ প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান বলেন, ‘ফায়ার সাবস্টেশন স্থাপনের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। এইকাজ চলমান রয়েছে।’
এস্টেট অফিসের প্রধান মো. আলউদ্দিন বলেন, ‘আমরা প্রশাসনকে মেয়াদউত্তীর্ণ অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের সংস্কারের জন্য ২ লক্ষ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছি। টেন্ডার পাস হলেই দ্রুত কাজ শুরু হবে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা জেনেই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে তা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা টেন্ডার করে দিয়েছি এনএসও হয়ে গেলে কাজ শুরু করবে। আশা করছি, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এই অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বসানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, ‘অতিদ্রুত ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন করা হবে। এছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরকে এগুলোর সঠিক ব্যবহার শেখানো এবং অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি বহির্গমন মহড়ার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবো।’



