জেড নিউজ ডেস্ক:
সংঘাত নিরসনে ইরানের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করার কোনো কৌশল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আছে বলে মনে হচ্ছে না। কূটনৈতিক ব্যর্থতায় যুদ্ধের আগুনে জ্বলছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। মধ্যস্থতাকারীদের কেউ কেউ আলোচনা পুনরায় শুরু করার কথা ভাবলেও বিষয়টি সহজ হচ্ছে না।
মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এই মুহূর্তে সক্রিয়ভাবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অবস্থায় নেই। সরাসরি কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আপাতত শেষ হয়ে গেছে বলেও তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সর্বশেষ দুপক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রেখেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে অবিশ্বাস আরও তীব্র হচ্ছে। কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা ও কৌশলের অভাবই এর প্রধান কারণ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে, অর্থাৎ গেল জুনের মাঝামাঝি সময়ে স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ভেস্তে যাওয়ার পরই পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নিয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেস্তে যাওয়া সমঝোতা স্মারকটি অনুমোদনে ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ রাজি ছিলেন। কিন্তু এখন তেহরান ট্রাম্পকে আর মোটেও বিশ্বাস করে না। ভয়ানক বিষয় হলো, ইরানিদের সম্পর্কে ট্রাম্পেরও এখন একই ধারণা জন্মেছে।
এই অবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিকে কেন্দ্র করে আংশিক সমঝোতা হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প ২০১৮ সালে তা থেকে সরে আসেন। তেহরানের বিরুদ্ধে তিনি সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টিকারী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। পরে ২০২০ সালের শুরুতে ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতা কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
প্রক্সি শক্তি সক্রিয় করতে আরও মনোযোগী তেহরান
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ইয়েমেনি প্রক্সি শক্তি হুথিদের আরও সক্রিয় করতে চাইছে তেহরান। ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরানি কর্মকর্তারা সতর্ক করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যদি সংঘাত আরও বাড়ায় অথবা আরব উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধে প্রবেশ করে, তাহলে ইয়েমেনি প্রক্সি বাহিনীকে (হুথি বিদ্রোহী) সক্রিয় করা হবে।
হুথিরা আগেই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে প্রবেশ করেছে। তারা ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপও করেছে। আল জাজিরা জানায়, গত ২০ জুলাই হুথিরা সৌদি সংশ্লিষ্ট জাহাজের বিরুদ্ধে সমুদ্র অবরোধ ঘোষণা করে এবং বাব এল মান্দেব প্রণালি দিয়ে সৌদি সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচল ঠেকানোর কথা জানায়। এরপরই সৌদি তেলবাহী দুই ট্যাংকারে হামলার দাবি করে হুথিরা। এর প্রভাব বাব এল মান্দেবেও পড়ে। জাহাজ চলাচল কমে যায় এবং কিছু জাহাজ পথ পরিবর্তন করে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন ১৪ দেশের একটি জোট বাব এল মান্দেব, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে জাহাজ চলাচল সুরক্ষার উদ্যোগ ঘোষণা করেছে।
এই অবস্থায় ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেওয়ার পর এখন বাব আল মান্দেব প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হয়ে উঠেছে। উভয় প্রণালিতে সমন্বিত বা পর্যায়ক্রমিক বিঘ্ন ঘটানো হলে তা বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে এক অভূতপূর্ব ধাক্কা সৃষ্টি করবে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলার পর হুথিরা দুর্বল হয়ে পড়লেও তাদের সাম্প্রতিক তৎপরতায় শক্তি প্রকাশিত হচ্ছে। সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছে।
বাব এল মান্দেব ঘিরে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট
হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল বন্ধ করে দেওয়ার পর ইরান এখন পর্যন্ত তার সবচেয়ে বিপজ্জনক তাসটি খেলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইয়েমেনের হুথি মিত্রদের ব্যবহার করে লোহিত সাগরের বাব এল মান্দাব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে, যা ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের একটি নতুন ফ্রন্ট তৈরি করবে। ফলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুই জ্বালানি ধমনী ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন হামলা গভীরতর হওয়া এবং হুথিদের পাল্টা হামলা বাড়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা বলছেন, তেহরান বাধ্য হয়ে উপসাগরের বাইরে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর হুমকি বাড়াচ্ছে, যাতে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়।
হরমুজ দিয়ে যান চলাচল ব্যাহত করে ইরান ইতোমধ্যেই তার সবচেয়ে মূল্যবান কৌশলগত সম্পদের শক্তি প্রদর্শন করেছে। এখন মনে হচ্ছে, দেশটি বাব এল মান্দাবে চাপ প্রয়োগের দ্বিতীয় কেন্দ্রবিন্দু খুলতে প্রস্তুত। এই সংকীর্ণ জলপথটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে। প্রণালিটি দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং বিশ্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পণ্য পরিবহন করা হয়।
হুথি প্রতিরোধ আন্দোলন আনসারুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরব যদি ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখে, তবে সশস্ত্র বাহিনী বাব এল মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপের ফলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছে যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুপক্ষ সর্বাত্মক যুদ্ধে অবিলম্বে ফিরে যাওয়ার চেয়ে একটি ধীর কিন্তু বৈশ্বিক ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে চলেছে। এতে পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক ডেনিস রস সতর্ক করে দিয়েছেন, যদি ওয়াশিংটন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা তীব্র করে, তবে তেহরান তার ইয়েমেনি মিত্রদের ব্যবহার করে বাব এল মান্দেব বন্ধ করে দিয়ে জবাব দিতে পারে, যা হরমুজ প্রণালির সৃষ্ট অর্থনৈতিক ধাক্কাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
সৌদি ভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ সাগের বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ওপর ক্রমশ বিশ্বাস হারাচ্ছে। তারা কূটনৈতিক সমাধানের পথ আর দেখছে না। সেক্ষেত্রে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, নৌচলাচলের ওপর হুথিদের যেকোনো হুমকি যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীদের পক্ষ থেকে একটি বৃহত্তর সামরিক প্রতিক্রিয়ার সূত্রপাত ঘটাতে পারে, যার লক্ষ্য হবে গোষ্ঠীটির সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা।





