মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমী
ধর্মীয় শিক্ষা শুধু নামাজ, রোজা বা ইবাদতের পাঠ নয়; বরং এটি মানুষের জীবনবোধ, ন্যায়নীতি, চরিত্র ও মানবতার পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা। ইসলাম ধর্ম মানুষকে শিক্ষা দেয় কীভাবে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য দায়িত্বশীল জীবনযাপন করতে হয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমে বলেছেন— পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।
আজকের আধুনিক সভ্যতা প্রযুক্তি বিজ্ঞান ও অর্থনীতির অগ্রগতিতে বিস্ময়কর উন্নতি অর্জন করেছে। মানুষ চাঁদে পা রেখেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে যন্ত্রকে চিন্তাশীল করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, মূল্যবোধের সংকট ও আত্মিক শূন্যতা বেড়েছে ভয়াবহভাবে। আজকের মানুষ জানে কীভাবে দ্রুতগতির ইন্টারনেট তৈরি করতে হয়, কিন্তু জানে না কীভাবে অন্তরের শান্তি অর্জন করতে হয়। এই নৈতিক সঙ্কটের মূলে রয়েছে ধর্মীয় শিক্ষার ঘাটতি— যা মানুষকে আত্মিক জাগরণ, মানবিকতা ও নৈতিকতা শেখায়।
ধর্মীয় শিক্ষা: মানুষের প্রকৃত পরিচয় গঠনের শিক্ষা
ধর্মীয় শিক্ষা শুধু নামাজ, রোজা বা ইবাদতের পাঠ নয়; বরং এটি মানুষের জীবনবোধ, ন্যায়নীতি, চরিত্র ও মানবতার পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা। ইসলাম ধর্ম মানুষকে শিক্ষা দেয় কীভাবে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য দায়িত্বশীল জীবনযাপন করতে হয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমে বলেছেন— পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। (সুরা আলাক: ১)
নবীজির প্রতি অবতীর্ণ ওহির এই প্রথম বাণী থেকেই বোঝা যায়, ইসলামে জ্ঞানের সূচনা স্রষ্টার নাম স্মরণ করে। অর্থাৎ জ্ঞানকে নৈতিকতা ও ঈমানের ভিত্তিতে গড়ে তোলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। (তিরমিজি শরিফ: ২৬৪৬)
এই হাদিসে “জ্ঞান” শব্দটি কেবল দুনিয়াবি বিদ্যা নয়; বরং সে জ্ঞান, যা মানুষকে আল্লাহর দিকে, ন্যায়ের দিকে ও মানবকল্যাণের দিকে পরিচালিত করে।
সমাজের বাস্তব চিত্র
আজকের সমাজে আমরা প্রযুক্তিগত উন্নতি দেখছি, কিন্তু নৈতিক অবক্ষয়ও সমানতালে বাড়ছে। পরিবার ভাঙছে, সন্তান পিতা-মাতার প্রতি অবাধ্য হচ্ছে, দুর্নীতি ও প্রতারণা সাধারণ হয়ে গেছে। শিশু থেকে তরুণ প্রজন্ম পর্যন্ত সামাজিক মাধ্যমে আসক্ত হয়ে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। এ অবস্থায় শিক্ষাব্যবস্থার মূল কেন্দ্রে যদি ধর্মীয় মূল্যবোধ না থাকে, তবে মানুষ যন্ত্রের মতো বুদ্ধিমান হলেও হৃদয়ে শূন্যতা থেকেই যাবে।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতাও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, বিদ্যালয় পর্যায়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষা যথাযথভাবে চর্চা না হওয়ায় শিশুদের মাঝে নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ কমে যাচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বা ব্যবসায়ে দক্ষ হলেও, সমাজ ও মানবতার প্রতি তাদের উপলব্ধি সীমিত।
ধর্মীয় শিক্ষার অভাব: সমাজে নৈতিক সংকট
যে সমাজে ধর্মীয় শিক্ষা অনুপস্থিত, সেখানে মানুষ নিজের স্বার্থকেই একমাত্র সত্য মনে করে। ফলাফল— দুর্নীতি, লোভ, অন্যায়, সহিংসতা, পারিবারিক ভাঙন। অথচ ইসলাম শিক্ষা দেয়— নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার ও আত্মীয়দের (তাদের হক) প্রদানের হুকুম দেন এবং অশ্লীলতা মন্দ কাজ ও জুলুম করতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো। (সুরা নাহল: ৯০)
এই আয়াতটি কেবল মসজিদে শোনার জন্য নয়, বরং প্রতিটি পরিবার, স্কুল ও অফিসে বাস্তবায়নের জন্য। যদি প্রতিটি শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই এই নীতি অন্তরে ধারণ করে বড় হয়, তবে সমাজে অন্যায়ের স্থান থাকবে না।
ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিকতার সমন্বয়
অনেকেই ভুলভাবে মনে করেন, ধর্মীয় শিক্ষা মানেই আধুনিক শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা। বাস্তবে ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা, যা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে গবেষণাকে উৎসাহিত করে। আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ। (ইবনে মাজাহ: ২২৪)


