জেড নিউজ ডেস্ক:
দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াত শুরু হচ্ছে আগামী রোববার। পর্যটনের নতুন মৌসুম ঘিরে দ্বীপের ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও পর্যটকের নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নে উদ্বেগ কাটেনি।
দ্বীপে থাকা আড়াইশর বেশি হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর একটিরও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেই। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদনও। অনেক স্থাপনায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পয়োশোধনাগার ও জরুরি নির্গমনপথের মতো মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুপস্থিত। বারবার দাবি সামনে এলেও দ্বীপটিতে গড়ে ওঠেনি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন; নেই অগ্নিনির্বাপণের প্রশিক্ষিত কোনো ইউনিট।
গত ১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর সেন্টমার্টিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দ্বীপের অধিকাংশ রিসোর্ট কাঠ, বাঁশ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি। সমুদ্রের প্রবল বাতাসে এসব স্থাপনায় আগুন ছড়িয়ে পড়লে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
এদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী রোববার থেকে পর্যটক যাতায়াত শুরু হলেও গত বছরের নির্দেশনার সব শর্ত বহাল থাকবে। ফলে নভেম্বরে দ্বীপে রাতযাপন করা যাবে না।
ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাতযাপনের সুযোগ থাকবে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান বলেন, গত বছরের প্রজ্ঞাপনে যেসব নির্দেশনা ছিল, সেটিই অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ এবার সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াতের সময়সীমা বাড়লেও রাতযাপনের ক্ষেত্রে গত বছরের নিয়মই বহাল থাকছে। তবে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অগ্নিনিরাপত্তা নেই, ঝুঁকি বাড়ছে
সেন্টমার্টিনের দক্ষিণপাড়া সৈকত সামুদ্রিক কাছিমের প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপের জেটি হয়ে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে সৈকতটির পাশে ইট, কাঠ আর বাঁশ দিয়ে নির্মিত হয়েছে কোরাল মুন বিচ রিসোর্ট। এখানে আছে দ্বিতল ছয়টি কটেজ। প্রতিটি কটেজে দুটি করে ১২টি কক্ষ। এর পাশেই বেলা ভিস্তা রিসোর্ট। এটির রয়েছে পাঁচটি কক্ষ।
একইভাবে দক্ষিণপাড়া সৈকতে এল মেরিনা ইকো রিসোর্ট, সিনবাদ এক্সপেরিয়েন রিসোর্ট, স্যান্ড ক্যাসেল রিসোর্ট, এসকেডি আমার বাড়ি রিসোর্ট, ব্লু মেরিন রিসোর্ট-২, সান সেট সেরেন্টি রিসোর্টসহ ২০টির বেশি রিসোর্ট রয়েছে। সবকটিই ইট, কাঠ আর বাঁশের তৈরি।
ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সেন্টমার্টিনে বর্তমানে হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর সংখ্যা আড়াইশর বেশি। এর মধ্যে গত পাঁচ বছরে তৈরি হয়েছে অন্তত ১৫০টি। সবকিছু পরিপাটি থাকলেও কোনো হোটেল-রিসোর্টেরই নেই অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা; নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। পয়োশোধনাগারও নেই। দুর্ঘটনার সময় বের হওয়ার জরুরি পথও অনেক প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় দিনের পর দিন এসব প্রতিষ্ঠান এভাবেই চলছে। অনিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন আরও অনেক হোটেলও গড়ে উঠছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্বীপের বসতবাড়িতে অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম তো নেই, এমনকি দ্বীপের কোনো হোটেল-রিসোর্টে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম নেই। কোনো স্থাপনায় আগুন লাগলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার কার্যকর ব্যবস্থাও নেই। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে বড় বিপর্যয় হতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, একের পর এক হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠলেও এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর স্থানীয় প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি নেই। কোথাও কোথাও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এসব অনিয়ম থেকে সুবিধা নিচ্ছেন।
গত এক বছরে ৩১ হোটেলের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ ছাড়া দ্বীপে পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে ১৫টি হোটেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তিন লাখ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে কোরাল মুন বিচ রিসোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইমরান বলেন, আপাতত না থাকলেও ১ নভেম্বর পর প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণের জন্য একটা ব্যবস্থা করা হবে।
টেকনাফ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কমান্ডার কামরুজ্জামান সুমন বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেলে স্পিডবোট ভাড়া করে টেকনাফ সদর থেকে গিয়ে আগুন নেভানোর কাজ করতে হয়। আবহাওয়া খারাপ থাকলে সাগরও উত্তাল হয়ে যায়। তখন যাওয়ার সুযোগ থাকে না।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সেন্টমার্টিন নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি। কারণ, এ দ্বীপের একটি হোটেল-রিসোর্টেরও ফায়ার ছাড়পত্র নেই। এমনকি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও নেই বললেই চলে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি দল আগামী বৃহস্পতিবার সেন্টমার্টিন দ্বীপ পরিদর্শনে যাবে। এরপর পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।’
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠ-বাঁশের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা দরকার। কিন্তু সেন্টমার্টিনে এগুলোর কিছুই নেই।
পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ
সেন্টমার্টিন শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি দেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৩টি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) একটি এই দ্বীপ। এখানে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি করে, এমন কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তবে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, পর্যটকের চাপ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে রয়েছে। হোটেল-রিসোর্টে পয়োশোধনাগার না থাকলে অপরিশোধিত বর্জ্য মাটি ও সমুদ্রের পানিতে মিশে দূষণ বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, সেন্টমার্টিনে পর্যটক নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া নির্দেশনাগুলো মোটামুটি সন্তোষজনক। তবে সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তিনি বলেন, পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রবাল দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন প্রয়োজন কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহি।





