spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

টয়-কার্টুনের কি মৃত্যু হয়েছে

জেড নিউজ ডেস্ক :   

একসময় একটি কার্টুন চরিত্রকে ভালোবাসার সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল— তাকে খেলনা আকারে হাতে তুলে নেয়া। আজকের শিশু সেই চরিত্রকে হাতে নেয় না, বরং তার ভেতরেই ঢুকে পড়ে। এ বদলই বদলে দিয়েছে খেলনা, অ্যানিমেশন ও শিশুদের বিনোদনের পুরো অর্থনীতি।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে একটি শিশুর শৈশবের কল্পনার জগৎ অনেক সময় শুরু হতো একটি খেলনা দিয়ে। হি-ম্যান অ্যান্ড দ্য মাস্টার্স অব দ্য ইউনিভার্স, ট্রান্সফরমার্স, জি আই জো, মাই লিটল পনি, কেয়ার বেয়ার্স, কিংবা টিনেজ মিউট্যান্ট নিনজা টার্টলস— এসব শুধু কার্টুন ছিল না, এগুলো ছিল খেলনা ও টেলিভিশনের এক শক্তিশালী ব্যবসায়িক পলিসি। অনেক ক্ষেত্রেই আগে তৈরি হয়েছে খেলনা, তারপর সেই চরিত্রকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কমিকস ও অ্যানিমেটেড সিরিজ।

ফলে তৈরি হয়েছিল এক অসাধারণ চক্র, খেলনা চরিত্র তৈরি করা হত, কার্টুন তাকে গল্প দিত, গল্প শিশুর আবেগ তৈরি করত, আর সেই আবেগ আবার বিক্রি করত খেলনাকে। ১৯৮০-এর দশকের শিশুতোষ টেলিভিশনে খেলনা কোম্পানিগুলোর এই প্রভাব এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে হি-ম্যান অ্যান্ড দ্য মাস্টার্স অব দ্য ইউনিভার্স, ট্রান্সফর্মার্স, জি.আই. জো, মাই লিটল পনি, কেয়ার বেয়ার্সের মতো সিরিজকে অনেক সময় খেলনা বিক্রির দীর্ঘ বিজ্ঞাপন হিসেবেও সমালোচনা করা হতো।

আরেকটি নতুন প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ— কিডাল্ট। অর্থাৎ, বড় হয়ে যাওয়া সেই মানুষ, যে এখরো খেলনা কেনে, কিন্তু খেলার জন্য নয়, সংগ্রহ, নস্টালজিয়া প্রকাশের জন্য। ফলে আজকের খেলনা শিল্প শুধু শিশুদের বাজার নয়, বড়রাও এর গুরুত্বপূর্ণ ভোক্তা। আর এই পরিবর্তন সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় পোকেমনের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজিসে

কিন্তু এ ব্যবস্থার সাফল্যের পেছনে শুধু অর্থনীতি নয়, ছিল শিশুমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্র্য— কল্পনাকে নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করার আনন্দ। একটি কার্টুন শিশুকে গল্প দেখায়, কিন্তু একটি খেলনা তাকে গল্প বানানোর সুযোগ দেয়। ট্রান্সফরমার্সের একটি চরিত্র দিয়ে সে নিজের মতো করে যুদ্ধ তৈরি করতে পারে, হি-ম্যান-কে অন্য কোনো চরিত্রের সঙ্গে লড়াই করাতে পারে, কিংবা পুরো ঘরের মেঝেকেই বানিয়ে ফেলতে পারে নিজের কল্পনার রাজ্য। খেলনাটি তখন শুধু পণ্য নয়; হয়ে ওঠে শিশুর কল্পনার অভিনেতা।

তারপর বিনোদনের জগতে এল ভিডিও গেম। টেলিভিশন বলল, ‘নায়ককে দেখো।’ ভিডিও গেম বলল, ‘তুমিই নায়ক হও।’ এটাই ছিল প্রথম বড় পরিবর্তন। আর ইন্টারনেট এসে সেই পরিবর্তনকে আরো গভীর করল। ইউটিউব, অনলাইন গেম, রবলক্স, ফোর্টনাইট এবং সামাজিক প্লাটফর্ম শিশুদের সামনে এমন এক বিনোদনজগৎ খুলে দিল, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কার্টুন শুরু হওয়ার অপেক্ষা করতে হয় না। অফকমের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে ৪-১৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ইউটিউব এখন প্রথম পছন্দের ভিডিও-গন্তব্যগুলোর একটি, এমনকি প্রায় পাঁচজনের একজন টেলিভিশনে অন্য কোনো সেবার নেয়ার আগে ইউটিউবে যায়। অর্থাৎ, একসময় শিশু কার্টুনের জন্য অপেক্ষা করত; এখন বিনোদন শিশুর জন্য অপেক্ষা করে থাকে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে—শিশুরা খেলনা ছেড়ে দিয়েছে, তাই খেলনা শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বাস্তবতা এত সরল নয়। বিশ্বের খেলনা বাজার ২০২৪ সালে দশমিক ৬ শতাংশ কমলেও ২০২৫ সালে তা আবার ৭ শতাংশ বেড়েছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০২৫ সালে ‘লাইসেন্সড টয়’-এর বিক্রি ১৫ শতাংশ বেড়ে বৈশ্বিক খেলনা বাজারের ৩৭ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থাৎ, খেলনা হারিয়ে যাচ্ছে না, খেলনার চরিত্র বদলে যাচ্ছে।

একসময় একটি শিশু একটি খেলনা হাতে নিয়ে তার কল্পনার জগতে প্রবেশ করত। আজকের শিশু হয়তো একটি স্ক্রিনে লগইন করে সেই জগতের ভেতরেই ঢুকে পড়ে। একসময় খেলনা ছিল কল্পনার দরজা। এখন সেই দরজাটি হতে পারে একটি গেইম, একটি ইউটিউব ভিডিও কিংবা একটি ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড। তাই হয়তো ‘ডেথ অব দ্য টয় কার্টুন’ কথাটিও পুরোপুরি সঠিক নয়। টয়-কার্টুনের মৃত্যু হয়নি। তার জগৎ শুধু টয়বক্সের বাইরে চলে গেছে— স্ক্রিনে, গেমে, সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং এক বিশাল ‘ট্রান্সমিডিয়া ইউনিভার্স’-এর মধ্যে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়