জেড নিউজ, ঢাকা:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্য ও ‘ডিটক্স’ নিয়ে নানা ধরনের ট্রেন্ড প্রায়ই আলোচনায় আসে। এর মধ্যে সম্প্রতি নজর কাড়ছে কফি এনিমা। শরীর থেকে টক্সিন বের করা, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা, লিভার পরিষ্কার রাখা কিংবা ওজন কমানোর মতো নানা দাবি করা হচ্ছে এই পদ্ধতি নিয়ে।কিন্তু এসব দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং ভুলভাবে বা বারবার কফি এনিমা ব্যবহার করলে অন্ত্রে প্রদাহ, সংক্রমণ, ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতাসহ গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কফি এনিমা আসলে কী?
এনিমা হলো এমন একটি চিকিৎসাপদ্ধতি, যাতে নির্দিষ্ট প্রয়োজনে মলদ্বার দিয়ে তরল প্রবেশ করানো হয়। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে এনিমা ব্যবহার করা হতে পারে। তবে কফি এনিমায় সাধারণ এনিমার তরলের পরিবর্তে তৈরি করা কফি ব্যবহার করা হয়। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি-চিকিৎসাগত প্রয়োজনে ব্যবহৃত মানসম্মত এনিমা এবং ঘরে বসে কফি দিয়ে ‘ডিটক্স’ করার চেষ্টা এক বিষয় নয়। কফি এনিমার মাধ্যমে শরীর পরিষ্কার, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো বা টক্সিন বের করে দেওয়ার দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কফি পান করা আর কফি এনিমা করা এক বিষয় নয়।
অন্ত্রে হতে পারে প্রদাহ
কফি এনিমার অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হলো অন্ত্রে প্রদাহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা। ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি সিস্টেমেটিক রিভিউতে স্ব-প্রয়োগ করা কফি এনিমা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন কেস রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে অন্ত্রের প্রদাহসহ একাধিক ক্ষতিকর ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। একই সঙ্গে কফি এনিমা কার্যকর-এমন নির্ভরযোগ্য গবেষণারও সন্ধান পাওয়া যায়নি। আরেকটি কেস রিপোর্টে কফি এনিমার পর একজন ব্যক্তির প্রোক্টোকোলাইটিস, অর্থাৎ মলদ্বার ও কোলনে প্রদাহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তার তলপেটে ব্যথা, রক্তপাত এবং বারবার মলত্যাগের তীব্র অনুভূতি দেখা দিয়েছিল।
অর্থাৎ পেট পরিষ্কার বা দ্রুত ওজন কমানোর আশায় নেওয়া এই পদ্ধতি উল্টো অন্ত্রের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সংক্রমণের ঝুঁকিও রয়েছে
ঘরে এনিমা তৈরি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বা তরল জীবাণুমুক্ত না হলে শরীরে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। কফি এনিমা নিয়ে প্রকাশিত চিকিৎসাবিষয়ক প্রতিবেদনে গুরুতর সংক্রমণ, এমনকি সেপসিসের ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে। তাই ‘প্রাকৃতিক’ বা ‘ঘরোয়া’ কোনো পদ্ধতি মানেই নিরাপদ-এমন ধারণা ঠিক নয়।
নষ্ট হতে পারে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য
সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো ইলেকট্রোলাইট হৃদ্স্পন্দন, স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বারবার এনিমা ব্যবহার করলে শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে।
চিকিৎসাবিষয়ক সাহিত্যে কফি এনিমার সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনাও প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনা বিরল হলেও ঝুঁকিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে হৃদরোগ, কিডনি বা লিভারের সমস্যা রয়েছে ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
বারবার এনিমা করলে বাড়তে পারে কোষ্ঠকাঠিন্য
কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে দ্রুত স্বস্তি পেতে কেউ কেউ এনিমার ওপর নির্ভর করেন। এতে সাময়িকভাবে মলত্যাগ হতে পারে। কিন্তু বারবার এনিমা ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। অতিরিক্ত ব্যবহারে কোলনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে।
আরেকটি সমস্যা হলো, দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রকৃত কারণ অজানাই থেকে যায়। খাদ্যাভ্যাস, কিছু ওষুধ, হরমোনজনিত সমস্যা কিংবা অন্য শারীরিক সমস্যার কারণেও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। কফি এনিমা এসব কারণ শনাক্ত বা চিকিৎসা করে না।
কফি এনিমার উপকারিতা নিয়ে গবেষণা যা বলে
শরীর ‘ডিটক্স’ করা, শক্তি বাড়ানো, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা উন্নত করা থেকে শুরু করে গুরুতর রোগের বিকল্প চিকিৎসা- কফি এনিমা নিয়ে অনলাইনে নানা দাবি রয়েছে। কিন্তু দাবিগুলোর সঙ্গে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মিল নেই।
২০২০ সালের সিস্টেমেটিক রিভিউতেও কফি এনিমার কার্যকারিতা প্রমাণ করে এমন গবেষণা পাওয়া যায়নি। বরং প্রকাশিত কেস রিপোর্টগুলোতে বিভিন্ন ক্ষতিকর ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। তাই নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় নিজে নিজে কফি এনিমা ব্যবহার করা নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয় না।
কোষ্ঠকাঠিন্য হলে যা করবেন
কোষ্ঠকাঠিন্য হলেই এনিমা না করে পর্যাপ্ত পানি পান, খাবারে আঁশ বাড়ানো, নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং মলত্যাগের স্বাভাবিক তাগিদ দীর্ঘ সময় চেপে না রাখা উপকারী হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকা, পেটে তীব্র ব্যথা, পায়খানার সঙ্গে রক্তপাত, অকারণে ওজন কমে যাওয়া কিংবা হঠাৎ মলত্যাগের অভ্যাসে বড় পরিবর্তন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কফি পান করা আর কফি এনিমা করা এক বিষয় নয়। কফি যেমন অনেকের দৈনন্দিন পানীয় হতে পারে, তেমনি সেটিকে শরীরের অন্য পথে ব্যবহার করলেই তা স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো ‘ডিটক্স ট্রেন্ড’ অনুসরণ করার আগে এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জানা জরুরি।





