জেড নিউজ ডেস্ক:
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আরেকটি গৌরবোজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক অর্জন যুক্ত হলো। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের তালিকা এবং কার্যবিবরণীতে তাঁর নাম ও এই নতুন পদবি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, জাইমা রহমান সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের এক্সিকিউটিভ অফিসের অধীনে লিগ্যাল অফিসার পদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। এই সুনির্দিষ্ট পদে তাঁর মূল কাজের ক্ষেত্র হবে সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমানকে বিভিন্ন আইনি ও নীতিগত বিষয়ে পরামর্শ প্রদান এবং সার্বিক সহযোগিতা করা। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই পদের কার্যপরিধি অত্যন্ত ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ।
সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের লিগ্যাল অফিসার সরাসরি জাতিসংঘের মূল আইন বিভাগের স্থায়ী কর্মকর্তা হিসেবে নন। তিনি মূলত সভাপতির ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক আইনি উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। সাধারণ পরিষদে কোনো নতুন প্রস্তাব বা রেজুলেশন কীভাবে উত্থাপন করা হবে, কোনো সদস্য রাষ্ট্র ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ উত্থাপন করলে সভাপতি কী ধরনের কৌশলগত বা আইনি সিদ্ধান্ত দেবেন কিংবা কোনো প্রস্তাবের সংশোধনী আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না—এসব জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়ে সভাপতিকে আইনি পরামর্শ দেওয়াই এই পদের মূল দায়িত্ব।
বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিন, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হয়। এসব ক্ষেত্রে সভাপতির প্রতিটি সিদ্ধান্ত যাতে জাতিসংঘ সনদ, দাপ্তরিক বিধি এবং পূর্বের ঐতিহাসিক নজিরগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইনি সহায়তা প্রদান করেন লিগ্যাল অফিসার। এছাড়া কোনো রেজুলেশন বা প্রস্তাব আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না কিংবা বাজেটসংক্রান্ত কোনো প্রস্তাবে অন্য কোনো বিশেষ কমিটির পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন আছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করার ক্ষেত্রেও এই দপ্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রবীণ কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মুন্সি ফয়েজ আহমেদের মতে, সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমান যেসব সুদূরপ্রসারী দায়িত্ব পালন করবেন, সেগুলোর আইনি দিকগুলোর সঠিক মূল্যায়নে জাইমা রহমান অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখছেন। তাঁর মতে, সভাপতির আইনি কার্যক্রমে সহায়তা করার জন্য একটি সুশৃঙ্খল দল কাজ করে, যেখানে লিগ্যাল অফিসারের ভূমিকা অত্যন্ত কেন্দ্রীয় ও চালিকাশক্তির মতো।
দাপ্তরিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও জাইমা রহমানের বহুমুখী দায়িত্ব রয়েছে। জাতিসংঘের মূল আইন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থার সঙ্গে সভাপতির কার্যালয়ের নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি কিংবা আইনগত বিভিন্ন বিষয়ে সভাপতির প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্যের খসড়া তৈরিতে সার্বিক সহায়তা করা তাঁর কর্মপরিধির অন্তর্ভুক্ত।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই কার্যালয়ে বিশ্বজুড়ে ২৯টি দেশের ৪০ জন দক্ষ সদস্যের একটি চৌকস দল কাজ করছে। এই আন্তর্জাতিক দলে বাংলাদেশের ছয়জনসহ অন্যান্য দেশের পেশাদাররা দায়িত্ব পালন করছেন। জাইমা রহমান ছাড়াও সভাপতির কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশিদের মধ্যে রয়েছেন কূটনীতিক মো. আব্দুল আলিম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন, মফিজুল ইসলাম, জাকির আহমেদ এবং মো. রফিকুল আলম মোল্লা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতিসংঘে স্থায়ীভাবে কর্মরত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সাধারণ পরিষদের সভাপতি নিজের আইনি ও প্রশাসনিক এখতিয়ার প্রয়োগ করে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট মেয়াদে কয়েকজনকে কার্যালয়ে নিয়োগ দিতে পারেন। তবে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা এবং আইনি অভিজ্ঞতার কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। সাধারণত আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী এবং বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা জাতিসংঘে কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আইনজীবীরাই এই ধরনের দায়িত্বে মনোনীত হয়ে থাকেন।
আইন ও নীতিনির্ধারণী অঙ্গনে জাইমা রহমানের বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতা রয়েছে। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে তাঁকে ব্যারিস্টার এবং আইন ও নীতি বিশ্লেষক হিসেবে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে তাঁর কাজের দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি স্বনামধন্য কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইন ও রাজনীতি বিষয়ে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়া ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ঐতিহ্যবাহী ‘দ্য অনারেবল সোসাইটি অব দ্য ইনার টেম্পল’ থেকে তিনি মর্যাদাপূর্ণ ব্যারিস্টারি সনদ লাভ করেছেন।
ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, জাইমা রহমান বর্তমানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতেও তালিকাভুক্ত অ্যাডভোকেট হিসেবে পেশাগতভাবে যুক্ত রয়েছেন। যুক্তরাজ্যে আবাসনের আইনি জটিলতা নিরসন, জনকল্যাণ এবং শ্রম আইন বিষয়ে কাজ করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের নানা আইনি পরামর্শ ও জনসংযোগে তাঁর যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। সামাজিক কল্যাণ এবং শিক্ষা আইনে তিনি বিভিন্ন সময় বিনামূল্যে আইনি সেবা বা ‘প্রো বোনো’ কার্যক্রমেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন।
সুশাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক জননীতি, ডিজিটাল নিরাপত্তা, বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার, মানসম্মত শিক্ষা এবং লিঙ্গসমতার মতো সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর কাজের গভীর আগ্রহ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ধরনের মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য জাইমা রহমানের পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা ও মেধা রয়েছে। সভাপতির আইনি কার্যক্রমে সুচারুভাবে সহায়তার মাধ্যমে তাঁর সামনে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও আইন প্রণয়নের এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।





