জেড নিউজ ডেস্ক :
মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ পাশাপাশি চলে। আজ যে ব্যক্তি সচ্ছল, সুস্থ ও নিরাপদ, কাল তিনিই অসুস্থতা, আর্থিক ক্ষতি, পারিবারিক সংকট কিংবা অন্য কোনো বিপদের মুখোমুখি হতে পারেন।
তাই অন্যের বিপদে আনন্দিত না হয়ে তার জন্য সহমর্মিতা প্রকাশ করাই মানবিকতা। কিন্তু বাস্তবে এমন মানুষও দেখা যায়, যারা কারো ব্যর্থতা, ক্ষতি বা দুর্দশায় মনে মনে খুশি হয়। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী, অপছন্দের ব্যক্তি কিংবা যার সঙ্গে বিরোধ রয়েছে, তার বিপদে কেউ কেউ আনন্দ প্রকাশ করে।
ইসলামে অন্যের বিপদে আনন্দ প্রকাশ করাকে নিরুৎসাহ করা হয়েছে।
এটার সঙ্গে যেমন সামাজিক সৌজন্যের সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি ঈমানি চরিত্রের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
কারো বিপদে আনন্দিত হওয়া ইসলামের শিক্ষা নয় : কোরআনে আল্লাহ তাআলা এমন কিছু মানুষের আচরণ উল্লেখ করেছেন, যারা মুমিনদের কল্যাণে কষ্ট পায় এবং তাদের বিপদে আনন্দিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের কোনো কল্যাণ হলে তা তাদের কষ্ট দেয়, আর তোমাদের কোনো অকল্যাণ হলে তারা তাতে আনন্দিত হয়। তোমরা যদি ধৈর্য ধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১২০)
এ আয়াতে অন্যের বিপদে আনন্দিত হওয়ার বিষয়টি এমন এক আচরণ হিসেবে এসেছে, যা মুমিনের চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যদিও আয়াতটির প্রেক্ষাপট নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর আচরণ নিয়ে, এর মাধ্যমে মানুষের এমন একটি নিন্দনীয় মানসিকতার চিত্র পাওয়া যায়, অন্যের ভালোতে কষ্ট পাওয়া এবং তার ক্ষতিতে আনন্দিত হওয়া।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, তোমার ভাইয়ের বিপদে আনন্দ প্রকাশ কোরো না। হতে পারে আল্লাহ তার প্রতি দয়া করবেন এবং তোমাকে বিপদে ফেলবেন।
’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫০৬)
হাদিসটি মানুষের জন্য গভীর সতর্কবার্তা। কারণ বিপদ কারো স্থায়ী পরিচয় নয়। আল্লাহ চাইলে মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে দিতে পারেন। তাই অন্যের বিপদ দেখে নিজেকে নিরাপদ ও শ্রেষ্ঠ মনে করার কোনো সুযোগ নেই।
অন্যের কল্যাণকামিতা ঈমানের দাবি : ইসলাম মুসলমানের সঙ্গে মুসলমানের সম্পর্ককে এমন পর্যায়ে নিতে চায়, যেখানে একজনের ভালো অন্যজনের আনন্দের কারণ হবে এবং একজনের কষ্ট অন্যজনকে ব্যথিত করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পূর্ণ মুমিন হবে না, যতক্ষণ সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪৫)
এই হাদিসের আলোকে অন্যের বিপদে আনন্দিত হওয়ার মানসিকতা নিয়ে আত্মপর্যালোচনা করা দরকার। আমি নিজের জন্য নিরাপত্তা, সুস্থতা, সম্মান ও সচ্ছলতা চাই; তাহলে অন্য মুসলমানের জন্যও একই কল্যাণ কামনা করা ঈমানি চরিত্রের অংশ। এ জন্যই রাসুলুল্লাহ (সা.) পারস্পরিক হিংসা, বিদ্বেষ ও সম্পর্কচ্ছেদ থেকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর হিংসা কোরো না, বিদ্বেষ পোষণ কোরো না এবং একে অপরের প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন কোরো না; বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৫৮)
অন্যের বিপদে আনন্দ অনেক সময় হিংসা, বিদ্বেষ কিংবা প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ হয়ে থাকে। তাই মুখের আচরণ পরিবর্তন করলেই হবে না; অন্তরকেও এসব রোগ থেকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করতে হবে।
বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মুমিনের সৌন্দর্য : কারো বিপদ দেখলে একজন মুমিনের প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত, তার জন্য কল্যাণ কামনা করা। সামর্থ্য থাকলে সাহায্য করা, অন্তত সান্ত্বনা দেওয়া এবং তার সম্মান রক্ষা করা উত্তম আচরণ। কারো ভুল বা অপরাধের কারণে সে বিপদে পড়লেও তার অন্যায়কে সমর্থন করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি তার দুর্দশাকে উপভোগ করাও মুমিনের আদর্শ নয়।
যে ব্যক্তি আজ অন্যের অসুস্থতা দেখে হাসছে, কাল সে নিজেও অসুস্থ হতে পারে। যে আজ অন্যের ব্যাবসায়িক ক্ষতিতে আনন্দিত হচ্ছে, তার নিজের ব্যবসায়ও একদিন ক্ষতি হতে পারে। আর যে অন্যের পারিবারিক সমস্যাকে উপহাস করছে, তার নিজের জীবনও সব সময় সংকটমুক্ত থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তাই কারো বিপদে আনন্দিত হওয়ার পরিবর্তে তার জন্য দোয়া করা, সম্ভব হলে সহযোগিতা করা উচিত। প্রত্যেক মুমিনের হৃদয় এমন হওয়া উচিত, যেখানে অন্যের পতনে উল্লাস নয়, বরং তার কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা জাগে।





