জেড নিউজ, ডেস্ক :
বর্তমানে আমরা খুব কঠিন সময় পার করছি। কারণ এখনকার মানুষের চোখে নিজের জীবনের অভাবগুলোই অনেক সময় বড় হয়ে ধরা দেয়; অন্যের প্রাচুর্য হয়ে ওঠে ঈর্ষার কারণ। কারো ভালো পেশা, দামি গাড়ি, বড় বাড়ি, ব্যবসার সাফল্য কিংবা সামাজিক মর্যাদা দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করতে শুরু করে অনেকে।
অথচ ইসলাম শেখায়—অন্যের প্রাচুর্যের দিকে তাকিয়ে আফসোস করা যাবে না; বরং নিজের জীবনে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতগুলোর দিকে তাকিয়ে শোকর আদায় করতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয়ই আমার আজাব বড় কঠিন।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৭)
শোকর মানে শুধু মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা আর অন্তরে দুঃখ পুশে রাখা নয়; বরং অন্তরে নিয়ামতের স্বীকৃতি, মুখে আল্লাহর প্রশংসা এবং কাজে সেই নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতার ছাপ প্রকৃত শোকর।
সম্পদ থাকলে তার শোকর হলো হালালভাবে উপার্জন করা, জাকাত দেওয়া, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং অপচয় থেকে বেঁচে থাকা। জ্ঞান থাকলে তা কল্যাণে ব্যবহার করা, ক্ষমতা থাকলে মানুষের অধিকার রক্ষা করা, এ সবকিছুই হলো মহান আল্লাহর নিয়ামতের শোকরের অংশ ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।
অন্যের সম্পদ দেখে নিজেকে ছোট মনে করা যাবে না। হীনম্মন্যতায় ভোগা যাবে না।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের চেয়ে নিম্নস্তরের লোকদের প্রতি দৃষ্টি দাও। তবে তোমাদের চেয়ে উঁচু স্তরের লোকেদের দিকে লক্ষ কোরো না। কেননা আল্লাহর নিয়ামতকে তুচ্ছ না ভাবার এটাই উত্তম পন্থা। (মুসলিম, হাদিস : ৭৩২০)
উল্লিখিত এই হাদিসের শিক্ষা বর্তমান সময়ের মানুষদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের সামনে অন্যের জীবনের চাকচিক্য প্রতিনিয়ত তুলে ধরছে।
ফলে অনেকের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অপ্রাপ্তির বেদনা ও অতিরিক্ত ভোগের আকাঙ্ক্ষা।
কে কত দামি ফোন ব্যবহার করে, কার গাড়ি কত বিলাসবহুল, কার আয় কত বেশি, কে নতুন নতুন প্লট-ফ্ল্যাট কিনছে, বিদেশ ভ্রমণ করছে— এসব তুলনা করতে গিয়ে মানুষ নিজের শান্তি হারাচ্ছে। অথচ মুমিনের জীবন প্রতিযোগিতার নয়, দায়িত্ব ও জবাবদিহির জীবন।
ইসলাম সম্পদ অর্জন নিষিদ্ধ করেনি। ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মদক্ষতা ও বৈধ উপায়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন প্রশংসনীয় হতে পারে; কিন্তু সম্পদের মোহ ও ওপরে ওঠার বেপরোয়া আকাঙ্ক্ষা যখন মানুষকে সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, জালিয়াতি, আত্মসাৎ কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করার দিকে ঠেলে দেয়, তখন সেই সম্পদ কল্যাণের বদলে ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যে প্রাচুর্য মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত করে, তা কখনো কল্যাণকর নয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হে লোক সকল! আল্লাহ তাআলা পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত কিছু কবুল করেন না। আল্লাহ তাঁর রাসুলদের যেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন, মুমিনদেরও সেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন। ‘হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো এবং সৎ কাজ করো। তোমরা যা করো সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত।’ (সুরা : আল-মুমিনুন, আয়াত : ৫১)
তিনি আরো বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের আমি যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার করো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৭২)
বর্ণনাকারী বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত এবং সারা শরীর ধুলি মলিন। সে আকাশের দিকে হাত দরাজ করে বলে, ‘হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন জীবিকাও হারাম। এমতাবস্থায় তার দোয়া কিভাবে কবুল হতে পারে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৯৮৯)
মুমিনের সফলতার সংজ্ঞা ধন-সম্পদ দিয়ে মাপা হয় না, বরং তা সম্পূর্ণ আলাদা। সুহায়ব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সব কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তারা সুখ-শান্তি লাভ করলে শুকরগুজার করে আর অসচ্ছলতা বা দুঃখ-মুসিবতে আক্রান্ত হলে সবর করে, প্রত্যেকটাই তার জন্য কল্যাণকর। (মুসলিম, হাদিস : ৭৩৯০)
অতএব, প্রকৃত মুমিনের জীবনে কোনো অবস্থাই পুরোপুরি ব্যর্থতা নয়। সচ্ছলতায় শোকর, সংকটে সবর, সাফল্যে বিনয় এবং ব্যর্থতায় আল্লাহর ওপর ভরসা—প্রতিটি অবস্থাই তার আখিরাতের পুঁজি হতে পারে। তাই জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশুদ্ধ ঈমান ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। অন্যের প্রাচুর্যের দিকে তাকিয়ে অশান্ত হওয়ার চেয়ে নিজের জীবনের নিয়ামতগুণে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করার মধ্যেই মুমিনের প্রকৃত সফলতা। কারণ হালাল রিজিক, অন্তরের তৃপ্তি, ঈমান ও তাকওয়াই প্রকৃত সফলতার ভিত্তি।




