০১/০৭/২০২৬, ১৫:৫৫ অপরাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    মৃত্যুফাঁদ বানায় মাকড়সা, শিকার নিজেই ঝাঁপ দেয় তাতে!

    জেড নিউজ ডেস্ক :

    মাকড়সার কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জালের ছবি। শিকার এসে জালে আটকে পড়বে, তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরবে— প্রকৃতিতে এ দৃশ্যই সবচেয়ে পরিচিত। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার উত্তর কুইন্সল্যান্ডের রেইন ফরেস্টে পাওয়া নতুন এক মাকড়সা সেই চেনা ধারণাকেই যেন পাল্টে দিয়েছে। জাল পেতে আর অপেক্ষা নয়, বরং শিকার নিজেই ফাঁদে কামড় বসিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ছিটকে চলে যায় মাকড়সার মূল জালে।

    প্রাচীন গ্রিসের পাথর নিক্ষেপকারী যুদ্ধাস্ত্র ‘ব্যালিস্তা’র সঙ্গে মিল থাকায় গবেষকেরা আপাতত এ মাকড়সার নাম দিয়েছেন ‘ব্যালিস্তা মাকড়সা’। মাত্র ৫ মিলিমিটার লম্বা এ প্রাণীর কমলা রঙের লম্বা পা আর সবুজাভ-হলুদ শরীর সহজেই চোখে পড়ে। এটি প্রোপোস্টিরা গণের সদস্য হলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন প্রজাতির নাম দেয়া হয়নি। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘কারেন্ট বায়োলজি’ সাময়িকীতে।

    এ মাকড়সার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এটি শুধু একটিমাত্র শিকারকেই লক্ষ্য করে। আর তা হলো সবুজ গাছপিঁপড়া। অন্য কোনো মাকড়সার ক্ষেত্রে এমন নির্দিষ্ট শিকার বেছে নেয়ার নজির এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এই পিঁপড়া খুব আক্রমণাত্মক। এরা প্রতিপক্ষকে কামড়ায়, ফরমিক অ্যাসিড ছুড়ে আত্মরক্ষা করে। আবার খুব সহজেই গাছে ওঠানামাও করতে পারে। কিন্তু এই আগ্রাসনই শেষ পর্যন্ত এদের বিপদ ডেকে আনে।

    আর এদের ফাঁদ তৈরির কৌশলও অবাক করার মতো। প্রথমে মাকড়সা এমন জায়গায় একটি নোঙর তৈরি করে, যেখানে সবুজ গাছপিঁপড়া নিয়মিত চলাচল করে। এরপর মূল জালের সঙ্গে যুক্ত টানটান ১৫ থেকে ৬০টি রেশমি সুতা দিয়ে শঙ্কুর মতো একটি কাঠামো বানায়। সবশেষে সেটিকে আরো পাতলা রেশমে মুড়ে দেয়। পুরো ফাঁদটির দৈর্ঘ্য মাত্র ৬ মিলিমিটার

    সবচেয়ে রহস্যময় অংশ শুরু হয় এরপর। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কোনো একটি সবুজ গাছপিঁপড়া এগিয়ে এসে শঙ্কুর গোড়ায় কামড় বসায়। কেন শুধু এই পিঁপড়াই এমন করে, তার নিশ্চিত উত্তর এখনো মেলেনি।

    গবেষকদের ধারণা, মাকড়সা হয়তো এমন কোনো রাসায়নিক সংকেত বা ফেরোমোন ব্যবহার করে, যা কেবল এ প্রজাতির পিঁপড়াকেই উত্তেজিত করে এবং আক্রমণে প্ররোচিত করে।

    প্ররোচিত হয়ে কামড় বসানোর সঙ্গে সঙ্গেই ভারসাম্য হারিয়ে শঙ্কুটি মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শঙ্কুটি ছিটকে উঠে পিঁপড়াটিকে তার চোয়ালসহ টেনে নিয়ে যায় মাকড়সার মূল জালে। এতে আশপাশের অন্য পিঁপড়ারা দল বেঁধে হামলা করার সুযোগ পায় না। আর সেখানে অপেক্ষা করে থাকে শিকারি মাকড়সা।

    গবেষণার প্রধান লেখক অজয় নরেন্দ্র জানান, মানুষের পেশি যে পরিমাণ শক্তি তৈরি করতে পারে, তার তুলনায় এ ক্ষুদ্র রেশমি ফাঁদ কয়েক হাজার গুণ বেশি ক্ষমতা তৈরি করতে পারে। এটি ধীরে ধীরে শক্তি জমা রাখে, কিন্তু এক মুহূর্তেই তা ছেড়ে দেয়। এতে অনেকটা চেপে রাখা স্প্রিং ছুটে যাওয়ার মতো শক্তি তৈরি হয়।

    এরকম দৃশ্য ধারণ করাও ছিল ফটোগ্রাফারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষকেরাও তাদের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম রেইন ফরেস্টে রাতের পর রাত ইনফ্রারেড আলো ও একাধিক ক্যামেরা নিয়ে অপেক্ষা করেছেন। প্রথম রাতে ফাঁদ সক্রিয় হওয়ার মুহূর্ত এত দ্রুত ঘটে যে প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ থেকে সাত হাজার ছবি তুলতে সক্ষম উচ্চগতির ক্যামেরিও প্রস্তুত হওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। সাধারণ ক্যামেরার ফুটেজে শুধু এক ফ্রেমে ফাঁদ আর পরের ফ্রেমে ঝুলতে থাকা পিঁপড়াকে দেখা যায়।

    পরে তারা প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ হাজার ফ্রেম ধারণ করে পুরো ঘটনাটি ধারণ করতে সক্ষম হন। দেখা যায়, ফাঁদটির ত্বরণ একটি ফর্মুলা-ওয়ান রেসিং গাড়ির ত্বরণের প্রায় ১০০ গুণ। এত ক্ষুদ্র রেশমের কাঠামোয় যে পরিমাণ শক্তি জমা থাকে, তা প্রকৃতির অন্যতম শক্তিশালী রেশমনির্ভর শিকারব্যবস্থাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

    গবেষকদের আগ্রহ এখানেই শেষ নয়। এশিয়াতেও প্রোপোস্টিরা গণের আরো কয়েকটি মাকড়সা রয়েছে। সেগুলোর শিকার কৌশলও কি এমন বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে? উত্তর খুঁজতে এখন সেদিকেই নজর দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। প্রকৃতি যে এখনো মানুষের অজানা অসংখ্য কৌশল নিজের ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছে, ক্ষুদে এই মাকড়সাই তার নতুন প্রমাণ।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়