আমিরুল ইসলাম কাগজী
মুস্তাফিজুর রহমান যিনি ভারতের আইপিএল ইতিহাসে ফিজ নামে বেশি পরিচিত,তাকে না করে দেওয়া হয়েছে। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কলকাতা নাইট রাইডার্স কে নির্দেশ দিয়েছে। এজন্য কেকেআর কে খেলোয়ার বদল করার অনুমতি দেবে বি সি সি আই। মুস্তাফিজ কোনো আইন ভাঙেননি, কোনো শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেননি এমনকি কোন রাজনৈতিক বক্তব্য দেননি তবুও তাকে বাদ দেওয়া হল।কারণ তিনি একজন বাংলাদেশি।
বিসিসিআই’র নির্দেশে কেকেআর যেভাবে মুস্তাফিজকে ছেড়ে দিল, সেটা ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নয়, এটা স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় রাজনীতির এক্সটেনশন। একজন খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়া হলো দুই দেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের জন্য।এটা ভয়ংকর নজির। ভারত এবং বাংলাদেশ একে অপরের প্রতিবেশী। ভারত হয়তো ভুলে গেছে বন্ধু বদলানো যায় কিন্তু প্রতিবেশী বদলানো যায় না। বাংলাদেশ চাইলেও প্রতিবেশী ভারতকে যেমন উপেক্ষা করতে পারবে না তেমনি ভারতও বাংলাদেশকে উপেক্ষা করতে পারবে না। একজন আরেকজনের দরকার হবে এটা ধ্রুব সত্য। ভারতের বিজেপি সরকার যেমন স্থায়ী নয় তেমনি বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকার স্থায়ী নয়। সরকার আসবে যাবে কিন্তু রাষ্ট্র থাকবে। সম্পর্ক হবে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে নয়। রেষারেষি থাকবে দ্বন্দ্ব থাকবে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনাও থাকবে। সেটা খেলার মাঠ পর্যন্ত পৌঁছাবে এমনটি মনে হয় আশা করা যায় না।
মুস্তাফিজকে নিলামে অনেক উচ্চ মূল্য দিয়ে কেকেআর দলভুক্ত করেছে। তার গত এক বছরের খেলা এবং ফিটনেস যাচাই-বাছাই করেই তারা নিয়েছে। সঙ্গত কারণেই এখন বলতে হচ্ছে ক্রিকেট মাঠে “ফর্ম” বা “ফিটনেস” নয়, বরং জাতীয় পরিচয় হয়ে উঠেছে বাদ পড়ার একমাত্র কারণ। একজন পেশাদার খেলোয়াড়কে ব্যবহার করা হচ্ছে কূটনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে।
রাষ্ট্রের আন্তসম্পর্ক শীতলতা থাকলে তার জবাব কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করা যায়, ক্রিকেট মাঠে নয়। ৩১ ডিসেম্বর ভারতের কূটনৈতিক শীর্ষ ব্যক্তি এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। সংকট থাকলে তারই সফরের মধ্য দিয়ে সমাধান হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তার যাওয়ার দুদিন পর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড যে সিদ্ধান্ত জানালো তা এক কথায় দুঃখজনক। আইপিএল কোনো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় না।আজ মুস্তাফিজের সঙ্গে এমন আচরণ করা হলো।কাল যে কেউ। এভাবেই চলতে থাকবে খেলোয়ারদের উপর অবিচার।
এমন একদিন আসবে যেদিন জাতীয়তা প্রতিভার চেয়ে বড় হয়ে যায়, সেদিন খেলাধুলা আর খেলা থাকবে না, হয়ে ওঠবে শুধুই রাজনীতি। আইপিএল এ রাজনীতির ধারাবাহিকতা: পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ
IPL শুরুর প্রথম আসর ২০০৮ এ পাকিস্তানি খেলোয়াড়রা খেলেছেন। কিন্তু ২০০৯ সালের মুম্বাই হামলার পর থেকে আজ পর্যন্ত একজন পাকিস্তানি ক্রিকেটারও IPL এ খেলতে পারেননি। কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা নেই, কিন্তু ভিসা, নিরাপত্তা ও “পরিস্থিতি”-র অজুহাতে পুরো একটি দেশের খেলোয়াড়দের বাইরে রাখা হয়েছে।
ওই সিদ্ধান্ত কখনো ক্রিকেটীয় ছিল না। ওটা ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক।
এবার একই যুক্তিতে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে KKR থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিল BCCI। বলা হলো, “সাম্প্রতিক উন্নয়ন” এবং দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা। অর্থাৎ একজন আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে দিল্লি–ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্কে কী চলছে তার ওপর।
এখানে কয়েকটা বিষয় পরিষ্কার; IPL কোনো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক লীগ নয়, এটি কার্যত ভারতের রাষ্ট্রীয় অবস্থানের সঙ্গে সংযুক্ত, খেলোয়াড়রা এখানে ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে বিচারাধীন।
পাকিস্তানি খেলোয়াড়রা এক যুগের বেশি সময় ধরে নিষিদ্ধ।
এখন বাংলাদেশি খেলোয়াড়ও সেই পথেই হাঁটছে।
আজ বলা হচ্ছে “ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি”।
কাল সেটাই হয়ে যাবে স্থায়ী নীতি।
IPL যদি সত্যিই “বিশ্বের সবচেয়ে বড় লীগ” হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, কেন এখানে কিছু দেশের জন্য নিয়ম আলাদা? কেন খেলোয়াড়দের দিয়ে পররাষ্ট্র নীতির দাম চুকানো হয়?
ক্রিকেটকে কূটনীতির হাতিয়ার বানালে, শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু খেলোয়াড় নয়
ক্ষতিগ্রস্ত হবে খেলাটার বিশ্বাসযোগ্যতা।



