জিয়া উদ্দিন
সত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আর-একটি নির্মম, অনাবৃত, কণ্টকময় সত্য—যাকে আমরা প্রতিদিন নানা কৌশলে, অজস্র প্রপঞ্চে ঢেকে রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা করি। সমাজের রঙচঙে মুখোশ, ক্ষমতার বর্ণিল আলো আর ভণ্ডামির শৌখিন সাজে সেই আসল সত্যকে কোথাও দেখা যায় না। আমরা চাই, সত্যটির অস্তিত্বই যেন মুছে যায়। অথচ কিছু মানুষ আছেন—যাদের দৃষ্টিশক্তি সাধারণ চোখের সীমা ছাড়িয়ে যায়; যাদের উপলব্ধিতে জ্বলে ওঠে এক ধরনের clairvoyance, তৃতীয় চক্ষুর প্রখর আলো। এই বিরল মানুষগুলোর দৃষ্টি যেন টেলিস্কোপিকও, আবার মাইক্রোস্কোপিকও—দূর থেকে দেখেও তারা পাপের বিন্দুকে পড়ে ফেলতে পারে, আর কাছে থেকেও তারা দেখতে পায় ক্ষমতার প্রাসাদের ভিতরে লুকানো অন্ধকার কুঠুরি।
এই মানুষগুলো সমাজের উপরিতলার বাহারি আবরণের আড়ালে চলমান রঙ্গমঞ্চকে একেবারে স্বচ্ছ ভাবে দেখতে পান। তারা দেখেন—কীভাবে দিনের আলোতে নির্লোভ দরবেশের বেশে ঘুরে বেড়ানো ব্যক্তিটি রাত ঘনালে পরিণত হয় অন্ধকারের নিজাম ডাকাতে। কীভাবে চরিত্রবানতার খোলস পরা ধর্মযাজক, নেতানেত্রী ও নীতিবক্তারা ক্লাইভের মতো লুটেপুটে দেশের রক্তমাংস বিদেশি ব্যাংকে পাচার করে। তারা দেখেন—কীভাবে রাষ্ট্রের অর্থনীতি এনিমিয়ার মতো রক্তহীন হয়ে পড়ে, আর দুর্নীতির ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে হ্যামারেজের মতো হু-হু করে রক্তক্ষরণ হয় প্রতিদিন।
এই দৃষ্টিমান মানুষগুলো উপলব্ধি করেন—কীভাবে দুর্নীতির অর্থ দিনে দিনে রাতারাতি পেয়ে যায় বৈধতার পবিত্র সনদ। কীভাবে অবৈধ উপার্জন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে উত্তরাধিকার হয়ে সমাজে সম্মানের প্রতীক হয়ে ওঠে। তখন মিথ্যার মোড়লীপনা পূর্ণতা পায় ষোলো কলায়; সত্যকে জৌলুসময় মিথ্যার রঙিন মোড়কে মুড়ে সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়—এই ছদ্মসত্যই নাকি আসল সত্য।
অর্ধশত বছরের বেশি সময় ধরে এদেশের মানুষ ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবনের ঘানি টানছে নিরন্তর। এখানে সত্য উন্মোচনের পথ এত ঘন মিথ্যার জালে আচ্ছন্ন যে সত্য যেন ধুলোমাখা অন্ধকার কোঠায় বন্দী। এ যেন পান্ডবহীন কুরুক্ষেত্র—যেখানে কৌরবের কোলাহলে ন্যায়বিচারের আর্তনাদ প্রতিদিন হারিয়ে যায়।
তবু প্রশ্ন রয়ে যায়—এই সমাজে কি কখনো জন্ম নেবে সত্য উন্মোচনের সেই বীর সংশপ্তক? কোনো নতুন প্রমিথিউস কি অন্ধকারের বিবর থেকে আগুন ছিনিয়ে আনবে? কোনো অর্ফিয়াস কি সত্যের সিম্ফনি বাজিয়ে ঘুমিয়ে থাকা জাতিকে জাগিয়ে তুলবে?
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—আলোকে কখনো চিরকাল বন্দী রাখা যায় না। অন্ধকার যত দীর্ঘ হয়, ভোর তত নিকটে আসে। তাই আমরা এখনো বুক বাঁধি আশায়; চাই নিকষ কালো আঁধারের বিদায় দিয়ে সমবেত কণ্ঠে আশার কোরাস গাইতে। কারণ আশা—এ জাতির শেষ সম্পদ, আর আশাহীনতা মানেই পরাজয়।
আমরা অপেক্ষায় আছি—
রংধনুময় নেতৃত্বের,
ন্যায় ও সত্যের পুনর্জাগরণের,
অন্ধকার ভেদ করে অরুণোদয়ের প্রথম আলোর।
আমরা অপেক্ষায় আছি—অরুন্ধতীর অরুনিমার।
লেখকঃ ডিআইজি এইচ আর
পুলিশ হেডকোয়ার্টার



