জেড নিউজ, ঢাকা:
গত ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শিক্ষার্থী, সাধারন মানুষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা কমীদের উপর গুলির নির্দেশদাতা প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দেয়া তথ্যানুযায়ী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গুলির নির্দেশ দেয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ৯৫ জনের তালিকার এবং সারাদেশের তিন শতাধিক কর্মকর্তাদের চিহিৃত করা হয়েছে। তালিকায় থাকা এসব কর্মকর্তাদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা আসার পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়-মন্ত্রিপরিষদ জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গুলির নির্দেশদাতা ম্যাজিস্ট্রেটরা গুপ্তভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক-৯ মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সারোয়ারকে ওএসডি করা হয়েছে। আগামীতে তালিকা থেকে আরো কিছু কর্মকর্তাদের ওএসডি করা হবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সাবেক সহকারী কমিশনার সায়েম ইমরানকে বিচারের আওতায় আনতে গতকাল বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ওএসডি করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অসদাচরণের জন্য সরকার ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ এবং ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আগামী ৫ আগষ্ট আগেই জুলাই জাদুঘর উদ্ধোধন করা হবে। তার আগেই বেশ কিছু গুলির নির্দেশদাতা কর্মকর্তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হতে পারে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দেয়া তথ্যানুযায়ী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গুলির নির্দেশ দেয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ৯৫ জনের তালিকার ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক-৯ মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সারোয়ার ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রেসিিেডন্টর প্রটোকল অফিসার এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এপিডি অনুবিভাগে দায়িত্ব দেয়া হয়। জুলাই আন্দোলনের সময় আগস্ট ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এ কর্মকর্তা বলেন, গত ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শিক্ষার্থী, সাধারন মানুষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা কমীদের উপর গুলির নির্দেশদাতা প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তালিকা চুড়ান্ত করেছে। তাদের আগে ওএসডি করা হবে। এর পরে বিচারে মুখোমুখি করা হবে।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো.এহছানুল হক বলেন, এ বিষয় এখনেই কথা বলা যাবে না। তবে সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কাজ করছেন।
জানা গেছে, ২০২৪-কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জুলাইয়ে রাস্তায় নেমে আসে অগণিত ছাত্র-জনতা। কোটা আন্দোলন রূপ নেয় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয় বিভিন্ন বয়সী দেড় সহস্রাধিক মানুষ। এ সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে দায়িত্ব পালন করা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা বিচারের আওতায় আসার কথা থাকলেও উল্টো তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতো প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এখনো বহাল রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। চব্বিশের জুলাই মাসের প্রথম দিকে কোটাবিরোধী ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলন দমন করতে সারা দেশে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিক্ষুব্ধদের ওপর ক্র্যাকডাউন চালানো হয়। বিভিন্ন বাহিনীতে থাকা সরকারের অনুগত লোকদের নামিয়ে দেয়া হয় রাস্তায়। সহিংস ওই পরিস্থিতিতে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিল অথবা আওয়ামী পরিবারের সদস্য এমন কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেয়া হয়। এসব কর্মকর্তাদের বিষয়ে নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন ইতিবাচক আসলে তাদের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব নিকারুজ্জামান সেই সময় কক্সবাজারের উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে ২০১৮ সালের রাতের ভোটে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তারা বাবা ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তার আপন ছোট ভাই তানভীর চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। জুলাই আন্দোলনের সময় নিকারুজ্জামান জুলাই রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব এস এম মুনিম লিংকন ৩০ জুলাই পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. আক্তারুজ্জান ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোছা আকলিমা বেগম ওই সময় ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তাকে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে বদলি করা হয়। বর্তমানে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (গাড়ি সেবা শাখা) মইন উদ্দিন ইকবাল ৪ আগস্ট ঢাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আলমগীর কবীর ৪ আগস্ট হানিফ ফ্লাইওভার, শনির আখড়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব স্নেহাশীষ দাশ এ কর্মকর্তা ১ থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত রামপুরা-বাড্ডাসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সুজিৎ দেবনাথ এ কর্মকর্তা জুলাই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। খন্দকার রবিউল ইসলাম জুলাই এবং ৫ আগস্ট রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন পদায়ন হওয়া সচিব মো. আতাউর রহমান খানের একান্ত সচিব হিসেবে পদায়ন হওয়া কর্মকর্তার নাম শেখ শামসুল আরেফিন। গুলির নির্দেশদাতা ম্যাজিস্ট্রেটদের তালিকায় এই কর্মকর্তার নাম রয়েছে। তিনি গত ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্ট ইসিবি এবং রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। একই মন্ত্রণালয়ে কর্মরত সিনিয়র সহকারী সচিব মেহেদী হাসান। এ কর্মকর্তা ৩১ জুলাই রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব সৈয়দ আশরাফুজ্জামান এ কর্মকর্তা জুলাইয়ের ৩১ তারিখ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন। একই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব দেবাংশু কুমার সিংহের নাম রয়েছে এই কর্মকর্তা আগস্টের ১, ২, ৩, ৫ তারিখ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেসির দায়িত্ব পালন করেছেন। একই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মাসুদ রানা এ কর্মকর্তা ৪ এবং ৫ আগস্ট মতিঝিল-হানিফ ফ্লাইওভারে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ১৮ জুলাই রামপুরা টিভি ভবন এলাকায় ২৭৯ রাউন্ড গুলির নির্দেশদাতা ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার সায়েম ইমরান ১৮ জুলাই ছাড়াও এই কর্মকর্তা ৩০ জুলাই এবং ৫ আগস্ট রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের (আইসিটি) সিনিয়র সহকারী সচিব সায়েম ইমরানকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংযুক্ত করা হয়েছে।
বর্তমানে ওই কর্মকর্তা ভোল পাল্টে চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভাগ্নে পরিচয় দিয়ে বর্তমান সরকারে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে ঢাকার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মকর্তারাও তালিকার তথ্যানুযায়ী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ৫১ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সব কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ঢাকার বাইরে বদলি করলেও বেশির ভাগই ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব পালন করছেন। আব্দুল্লাহ আল রনী পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে এবং রাফে মোহাম্মদ ছড়া আশুগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মৌসুমী নাসরিন মানিকগঞ্জ সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, শরীফ মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে বহাল থাকা সাদিয়া আক্তার নারায়ণগঞ্জ সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি), নুসরাত নওশীন ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে বহাল, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে,মনিষা রানী কর্মকার শিবালয়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, আসিফ রহমান নবাবগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি), শাইখা সুলতানা শিবচরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া গত ২০২৪ সালের জুলাই থেকে আগস্টের ৫ তারিখ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলায় ম্যাজিস্ট্রেসির প্রায় তিন শতাধিক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের শাস্তির আওতায় আসছে সরকার।





