ড.মোঃশরীফুল ইসলাম দুলু
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু দেখা কঠিন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—অনেক রাজনৈতিক দলই নিজেদের আদর্শের জায়গা থেকে সরে এসে ভোটের বাজারে টিকে থাকতে এক ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ মানিয়ে নেওয়ার রাজনীতি শুরু করেছে। এই পরিবর্তনের ঢেউ সবচেয়ে চোখে লাগে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে। দলটি দীর্ঘদিন নিজেদের কোর ইডিওলজি হিসেবে ইসলামকে সামনে রেখে রাজনীতি করেছে। কিন্তু আজ তাদের কার্যক্রম, বক্তব্য, এমনকি সাংগঠনিক রূপরেখা দেখে প্রশ্ন ওঠে—এটা কি এখনও জামায়াতে ইসলাম, নাকি ধীরে ধীরে জামায়াতে ইনসান হয়ে উঠছে?
এখানে “ইনসান” শব্দটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দলটি এখন শুধু মুসলিম ভোটার বা ইসলামী আদর্শভিত্তিক ভোটের রাজনীতি করছে না; বরং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার, তাদের খুশি করার এবং সর্বধর্মীয় কাঠামোয় কাজ করার একটি অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো: এই প্রবণতা কি আদর্শিক পরিপক্বতার ফল, নাকি নিছক রাজনৈতিক টিকে থাকার লড়াই?
জামায়াতের মৌলিক আদর্শ: কোথায় শুরু, কোথায় দাঁড়িয়ে এখন?
জামায়াতে ইসলামের জন্ম হয়েছিল ইসলামী মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে একটি রাজনৈতিক-সামাজিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে। তাদের প্রকাশিত নথি, সাহিত্য, রাজনৈতিক ভাষণ—সব জায়গায় একই বার্তা: ইসলামই রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি, এবং মুসলমানের পরিচয়ই তাদের সংগঠনের কেন্দ্রে।
কিন্তু মাঠের রাজনীতি অন্য কথা বলে।
আজ দেখা যাচ্ছে—
* হিন্দু শাখা কমিটি,
* ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন,
* রোজা–পূজা–উৎসবের যৌথ প্রচারণা,
* কোরআনের ব্যাখ্যার পাশাপাশি বহু ধর্মীয় উপাদান ব্যবহার,
* ভোটার তোষণের জন্য ইসলামের বাইরে ভিন্ন ধর্মীয় আচারকে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরা।
এসব মিলিয়ে প্রশ্ন ওঠে: এটি কি ইসলামী আদর্শ রক্ষার রাজনীতি, নাকি ক্ষমতায় যাওয়ার শর্টকাট?
ক্ষমতার মোহ এবং সাংগঠনিক দিশেহারা অবস্থাএক সময় জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল দৃঢ়, স্পষ্ট, এবং আদর্শসংগত। আজ তাদের অবস্থা অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়—কী করবে, কোন পথে যাবে, কোন আদর্শ ধরে রাখবে—এ নিয়ে তাদের স্পষ্টতা নেই।
ক্ষমতার মোহ রাজনীতিকে কীভাবে বদলে দেয়, তার textbook উদাহরণ এখন জামায়াত।প্রতিটি রাজনীতিবিদ জানে—ক্ষমতা না থাকলে দল বাঁচানো কঠিন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্ষমতার প্রয়োজনে কি নিজের মূল পরিচয় বদলে দিতে হবে?
যদি একটি দল ইসলামের ভিত্তিতে রাজনীতি করে, এবং সে দলই যদি সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের খুশি করার জন্য নিজেদের অবস্থান সফট করে, আদর্শকে পাশ কাটিয়ে সবার মন রক্ষায় ব্যস্ত হয়—তবে এটি আদর্শিক রাজনীতি থাকে না। এটা হয়ে যায় ভোট-ভিত্তিক বাণিজ্যিক রাজনীতি।
জামায়াতে ইসলাম নাকি জামায়াতে ইনসান?
এখন বড় প্রশ্ন:
যদি জামায়াতে ইসলাম সব মানুষের রাজনীতি করতে চায়—তাতে সমস্যা কী?
সমস্যা নয়, বরং যৌক্তিকই বলা যায়।
কিন্তু তখন দলের নাম ও আদর্শের সঙ্গে বাস্তব আচরণকে মিলিয়ে দেখতে হয়।
কারণ “জামায়াতে ইসলাম” নামটি বহন করে ইসলামী রাষ্ট্রনীতি, শরীয়াহভিত্তিক মূল্যবোধ, মুসলিম পরিচয়, এবং ধর্মীয় কাঠামো কেন্দ্রীক রাজনীতির প্রতিশ্রুতি।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা—
* সর্বধর্মীয় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম,
* হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কমিটি,
* ধর্মীয় আচারের মিশ্র ব্যবহার,
* ইসলামী আদর্শের বাইরে নীতি গ্রহণ,
* ভোটের গণিতের কারণে আদর্শের নমনীয়তা,
* এবং কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে স্পষ্ট বিভ্রান্তি—
এসব মিলিয়ে দলটি বাস্তবে “ইনসান”—মানে সাধারণ মানুষের রাজনীতি—করে ফেলছে।
তাহলে কি নাম পরিবর্তন যৌক্তিক?
এক অর্থে হ্যাঁ।
যদি জামায়াতে ইসলামের উদ্দেশ্য হয় সব মানুষের রাজনীতি করা, ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা ছাড়ানো, এবং inclusive রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা—তাহলে “জামায়াতে ইনসান” নামটি অনেক বেশি সঙ্গতিপূর্ণ।
এতে দলটির রাজনীতি আরও মানবিক শোনায়, এবং পরিষ্কার বার্তা দেয়—তারা কেবল ধর্ম নয়; মানুষের অধিকারের রাজনীতি করতে চায়।
এখানে একটি মূল বিপরীত বাস্তবতা আছে
জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে বলেছে—
“ইসলামই আমাদের রাজনীতির ভিত্তি।”
সেই দলই এখন হিন্দু শাখা কমিটি খুলে ফেলছে।
যে দল ইসলামিক স্টেটের মডেল নিয়ে কথা বলে, সেই দলই এখন শারদীয় দুর্গাপূজার মঞ্চে উপস্থিত হয়ে জনগণের মন জয় করার চেষ্টা করছে।
এটা কি আদর্শের বিবর্তন, নাকি রাজনৈতিক কৌশলগত আত্মসমর্পণ?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশ বলছেন—এটা আদর্শের বিবর্তন নয়; বরং রাজনৈতিক টিকে থাকার জন্য forced adaptation।
কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা: জামায়াতের বড় সংকট
আজ জামায়াত নিজেদের একটি অস্তিত্ব সঙ্কটের মধ্যে ফেলেছে।
তাদের আদর্শের অনুসারীরা বিভ্রান্ত—
“এটা কি সেই দল যা ইসলামী শাসনব্যবস্থা চাইত?”
অন্যদিকে নতুন ভোটাররা ভাবছে—
“এটা কি সত্যিকারের ইনক্লুসিভ দল, নাকি ভোটের জন্য temporary soft tone?”
দুই দিক থেকেই প্রশ্ন, এবং কোন দিকেই তাদের স্পষ্ট উত্তর নেই।
রাজনৈতিক সমীকরণ বদলালে আদর্শ কোথায় দাঁড়াবে?
একটি দলের আদর্শ তখনই শক্ত থাকে, যখন দলটি সংকটে থেকেও সেটি ধরে রাখে।
জামায়াত সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি।
আজ তারা রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে গ্রহণ করেছে—যা ভালো।
কিন্তু সেটা করেছে নিজেদের মৌলিক আদর্শকে অস্পষ্ট করে—যা সমস্যা।
এক কথায়:
জামায়াত এখন neither here nor there.
তাহলে পথ কোনটি?
বিকল্প তিনটি:
* আদর্শে ফিরুন — ইসলামিক আদর্শকে ভিত্তি মেনে আবার সেই কোর ভ্যালুতে স্থিত হওয়া।
* আদর্শ বদলান — স্পষ্টভাবে inclusive human-centric politics ঘোষণা করা।
* নাম ও পরিচয় সামঞ্জস্য করুন — “জামায়াতে ইনসান” নামটির মতো, মানবিক রাজনীতির স্পষ্ট পরিচয় দেওয়া।
কিন্তু মাঝামাঝি থাকা—
একদিকে ইসলাম, অন্যদিকে বহু ধর্মীয় কাঠামো—
এটা রাজনৈতিকভাবে অস্থির এবং আদর্শিকভাবে অস্পষ্ট।
শেষ কথা
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ আজ এক ধরনের রাজনৈতিক কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার ভেতরে।
ক্ষমতার মোহ তাদের আদর্শে সন্দেহ তৈরি করেছে, কর্মীদের মধ্যে দ্বিধা বাড়িয়েছে, এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে অনিশ্চিত করেছে।
তারা যদি সব মানুষের জন্য রাজনীতি করতে চায়—
তা স্বাগতযোগ্য।
কিন্তু তখন “ইসলাম”কেন্দ্রিক রাজনৈতিক পরিচয়কে বদলাতে হবে, বা অন্তত স্পষ্ট করতে হবে।
নইলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণকারীরা প্রশ্ন তুলতেই থাকবেন—
এটা কি জামায়াতে ইসলাম,
নাকি নতুন জামায়াতে ইনসান?
লেখকঃ
রাজনীতি বিশ্লেষক ও গবেষক



