১৬/০১/২০২৬, ৪:২৯ পূর্বাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    চাটুকার বুদ্ধিজীবীরা নিক্ষিপ্ত হয় ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে

    দৃষ্টিপাত

    যুগে যুগে, দেশে দেশে দালাল, তাঁবেদার ও চাটুকার বুদ্ধিজীবীর উত্থান-উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। শাসকগোষ্ঠীর স্তুতি ও প্রশংসার বিনিময়ে তারা পেয়ে থাকেন শাসকদের আনুকূল্য। এতে তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ হলেও জাতি হয় ক্ষতিগ্রস্ত। এ স্তাবকগোষ্ঠী প্রধান শাসককে চারদিক থেকে ঘিরে রাখে এবং তার পদলেহনে ব্যস্ত থাকে। আমাদের দেশের বেলায়ও এটি অকাট্য সত্য। শাসকের উত্থান-পতনের সঙ্গে চাটুকারগোষ্ঠীরও উত্থান-পতন ঘটে। তবে একথাও অতীব সত্য, অধিকাংশ শাসকই চাটুকার পরিবেষ্টিত থাকতে ভালোবাসেন। রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, এমনকি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাতেও তাঁবেদার শ্রেণির উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। শাসকদের অধঃপতনের জন্য এরা অনেকাংশে দায়ী।

    অবস্থাদৃষ্টে আমার বহুবার মনে হয়েছে, আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের একটি বিরাট অংশ নানাভাবে শাসক ও শোষক শ্রেণির পদলেহনে ব্যস্ত। নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তারা শুধু আত্মসমর্পণই করেননি, আত্ম বিক্রিও করেছেন। সত্যের সন্ধান করা, সত্য কথা বলা দূরে থাক, মিথ্যা বলা এবং চাটুকারিতাই তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাসকের মনোরঞ্জন এবং শোষকের সন্তুষ্টি বিধান করে তারা তৃপ্ত হন। অবশ্য এটি তাদের শ্রেণি চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। চাটুকারদের একটি কমন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এরা চরিত্রগতভাবে আত্মসম্মানবিবর্জিত হয়ে থাকেন। চরমভাবে অপমানিত হলেও এরা কিছু মনে করেন না। তাদের কাছে আত্মসম্মান নয়, স্বার্থ উদ্ধারই বড় কথা।

    সমাজে দুটি মৌলিক শ্রেণি থাকে, যার একটি উৎপাদনের উপায়ের মালিক শ্রেণি, যারা শাসক, শোষক ও নিপীড়ক। আরেকটি উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা থেকে বঞ্চিত শ্রেণি, যারা প্রধানত উৎপাদন সংগঠনে শ্রম দিয়ে থাকে; তারা শাসিত, শোষিত ও নির্যাতিত। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের দুটি মৌলিক শ্রেণি হলো-১. পুঁজিপতি বা বুর্জোয়া শ্রেণি-এরা শাসক ও শোষক শ্রেণি এবং ২. শ্রমিক শ্রেণি বা সর্বহারা শ্রেণি-এরা শাসিত ও শোষিত শ্রেণি।

    এ দুটি মৌলিক শ্রেণির বাইরে অমৌলিক শ্রেণির (non-basic class) অবস্থান। বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী তথা বুদ্ধিজীবীরা একটি অমৌলিক শ্রেণি। এরা মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্গত; আর মধ্যবিত্ত শ্রেণি যে সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগী, তা এক প্রমাণিত সত্য। পুঁজিবাদী সমাজে তারা বুর্জোয়া শাসক শ্রেণির সহযোগী। শাসক শ্রেণির সব ধরনের শোষণ, বঞ্চনা ও নির্যাতনের সহযোগী শক্তি হিসাবে এরা কাজ করে। আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে গত দেড় দশকে শাসক শ্রেণির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এরা অনেক বেশি সক্রিয় ও সোচ্চার ছিল। এরা অন্যায় শাসন কায়েমে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল।

    এ কথা সত্য, সমাজে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারে লেখক, কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী; যাদের আমরা সাধারণভাবে বুদ্ধিজীবী হিসাবে জানি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের সমাজে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীর উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে, যারা শাসক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় আত্মনিয়োগ করেছেন এবং শাসকদের স্বার্থে কাজ করার মধ্য দিয়ে তারা হীন স্বার্থ হাসিল করে চলেছেন। স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থের জন্য এরা প্রভু বা শাসকদের পদলেহনে ব্যস্ত। শাসকের মনোরঞ্জন ও স্তুতিতে (পদলেহনে) এরা খুবই দক্ষ ও পটু। পদ-পদবির লোভে এরা নানাভাবে শাসক ও শক্তিধরদের তুষ্ট রাখতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। দালালি ও পদলেহনের প্রতিযোগিতায় যারা অগ্রগামী থাকেন, তারা শাসক-শোষকের নৈকট্য লাভ করেন এবং বড় বড় পদ-পদবি ও পুরস্কার বাগিয়ে নেন। এ প্রতিযোগিতায় যারা পেছনে থাকেন, তারাও ছিটেফোঁটা হালুয়া-রুটি ও ছোটখাটো আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত হন না।

    বিগত সরকারের আমলে আমরা চাটুকারিতার নগ্ন প্রতিযোগিতা প্রত্যক্ষ করেছি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাকে চাটুকাররা মানবতার জননী, গণতন্ত্রের মানসকন্যা, উন্নয়নের রূপকার ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। একজন ইসলামি ব্যক্তিত্ব শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে তাকে ‘জান্নাতি মানুষ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। অবশ্য গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সেই ব্যক্তি বলেছেন, তিনি এমন কথা বলেননি। মিডিয়া তার বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশ সফর করে দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলন করতেন। সেখানে চাটুকার ও স্তাবক সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিযোগিতা শুরু হতো শেখ হাসিনার প্রশংসা কে কতভাবে করতে পারেন। এক সাংবাদিক শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, নেত্রী আপনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। আপনি লবিস্ট নিয়োগ দেন। চাটুকাররা শেখ হাসিনার এ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিষয়টি ভালোভাবেই অবহিত ছিলেন। তারা নানাভাবে চাটুকারিতা করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। ছাত্র গণআন্দোলনে পতনের মুখে দাঁড়িয়েও তিনি চাটুকারদের চিনতে পারেননি। তাই তাদের স্তুতি বাক্যে যারপরনাই খুশি হতেন। চাটুকারদের প্রশংসা শেখ হাসিনাকে দেশের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে দেয়নি।

    এমন বিরূপ পরিস্থিতিতেও ন্যায় ও সত্যের পূজারি স্বল্পসংখ্যক বুদ্ধিজীবীকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়। শত নিপীড়ন ও নির্যাতন উপেক্ষা করে তারা বিশ্বাসে অবিচল থাকেন। সর্বকালে সব সমাজেই এ ধরনের উদাহরণ প্রত্যক্ষ করা যায়। মানব ইতিহাসে চাটুকার ও দালাল বুদ্ধিজীবীদের অনৈতিক কার্যকলাপের যেমন প্রমাণ পাওয়া যায়, তেমনি নির্লোভ, ত্যাগী বুদ্ধিজীবীদের শুভশক্তির পক্ষে অবস্থান গ্রহণের কাহিনিও লিপিবদ্ধ আছে। যুগে যুগে, দেশে দেশে, সমাজ বদলের আন্দোলন-সংগ্রামে বুদ্ধিজীবীদের অংশগ্রহণের বহু উদাহরণ আছে। কিন্তু যারা শোষিত মানুষ তথা সর্বহারা শ্রেণির মুক্তির মহান লক্ষ্য অর্জনে বিপ্লবী আদর্শকে ধারণ করেছেন এবং শ্রেণিস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে শোষিত ও সর্বহারা শ্রেণির সঙ্গে একাত্ম হয়ে শ্রেণিসংগ্রামকে এর যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছেন, তাদের সংখ্যা বিরল।

    দার্শনিক মার্কসের মতে, ‘philosophers have hitherto interpreted history, now the task is to change it’, অর্থাৎ ‘দার্শনিকরা এযাবৎকাল মানব ইতিহাসের ব্যাখ্যা করেছেন, এখন কাজ হবে একে বদলে দেওয়ার।’ দার্শনিক কার্ল মার্কসের এ উক্তির আলোকে এ কথা স্পষ্টতই বলা যায় যে, দার্শনিক তথা লেখক, চিন্তাবিদ, পেশাজীবী, এক কথায় বুদ্ধিজীবীদের কাজ শুধু সমাজ বিকাশের ইতিহাস ব্যাখ্যা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা। এখন প্রয়োজন তাদের সমাজের মৌলিক পরিবর্তনে অংশগ্রহণ করা। বিদ্রোহ-বিপ্লবে তথা সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনে যেমন বুদ্ধিজীবীদের অংশগ্রহণের উদাহরণ মেলে; অন্যদিকে এর বিপরীত স্রোতের বুদ্ধিজীবীদের ভূরি ভূরি উদাহরণও আছে।

    ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে কাজ করেছিলেন তখনকার বুদ্ধিজীবীদের এক বিরাট অংশ। মুষ্টিমেয় স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবী যারা এর বিরোধিতা করেছিলেন, তারা নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। কিন্তু আজ প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৭১ সালে যারা গণতন্ত্রের কথা বলেছিলেন, তারা বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গণতন্ত্রের প্রসঙ্গে ছিলেন একেবারেই নিশ্চুপ। বরং সরকারের স্বৈরাচারী আচরণকে তারা নানাভাবে যৌক্তিকতা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন; গণতন্ত্রের প্রশ্নে ছিলেন নীরব। তারা গণতন্ত্রের পরিবর্তে তথাকথিত উন্নয়নের গুণকীর্তনে ছিলেন ব্যস্ত। অনেকে সরকারকে এমন ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন যে, উন্নয়নের স্বার্থে গণতন্ত্রকে বিসর্জন দেওয়া দোষের কিছু নয়। একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী সরকারের এ বক্তব্যকে জনপ্রিয়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন অহর্নিশি। তারা উন্নয়নের কথা বলেন, কিন্তু ভুলে যান গণতন্ত্রহীনতায় যে উন্নয়ন, তা মূলত আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করার কৌশল মাত্র। এ ধরনের উন্নয়ন কখনোই টেকসই হয় না, জনকল্যাণ তো নয়ই। গণতন্ত্র ছাড়া যে উন্নয়ন হয় না, তা তারা বুঝেও না বোঝার ভান করেন। পাকিস্তানি স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খানও উন্নয়নের কথা বলতেন। তিনি উন্নয়নের এক দশক পালন করেছিলেন। তখনকার বুদ্ধিজীবী ও জনগণ ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করে গণতন্ত্র ও নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। আইয়ুব খানের নির্যাতন-নিপীড়ন যতই বেড়েছে, আমাদের আন্দোলন-সংগ্রাম ততই বেগবান হয়েছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।

    আমাদের দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে বুদ্ধিজীবীদের গৌরবোজ্জ্বল অবদান রয়েছে। কিন্তু এখনকার বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশই তা বেমালুম ভুলে গেছেন। আইয়ুব ও এরশাদের আমলের বুদ্ধিজীবীদের মতোই তারা দেখেও দেখেন না, শুনেও শোনেন না। বিগত সরকার আমলে আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছি, একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী লজ্জা, বিবেক এবং হিতাহিত জ্ঞান বিসর্জন দিয়ে স্বৈরাচারের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গল্প এবং গীত রচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সম্প্রতি এক তরুণ কলামিস্ট এ ধরনের বুদ্ধিজীবীদের নামকরণ করেছেন ‘বুদ্ধিযুক্ত জিহ্বাধারী’। দার্শনিক মার্কসের সমাজ বদলের মর্মবাণী এদের কর্ণকুহরে কখনো প্রবেশ করেছে কিনা জানি না। আর প্রবেশ করলেও তা তাদের গ্রাহ্য করার কথা নয়। সমাজ বদল নয়, তারা সমাজকে আরও পিছিয়ে দিতে সক্রিয়।

    আত্মসমর্পিত বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র মুৎসুদ্দী চরিত্র। এদের জাতীয় চরিত্র নেই বিধায় দেশপ্রেমও নেই। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এরা দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বিদেশে শাসক ও শোষক শ্রেণির এজেন্ট হিসাবে কাজ করেন। প্রভুদের স্বার্থ রক্ষা এবং মনোরঞ্জন করাই এদের কাজ। বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশে এখনো একটি জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির উত্থান ঘটেনি। এখানকার বুর্জোয়ারা কম্পারেডর বুর্জোয়া অর্থাৎ মুৎসুদ্দী বুর্জোয়া। এদের অনুসারী তল্পিবাহক বুদ্ধিজীবীরা দেশের সম্পদ পাচার বা স্বার্থ বিকিয়ে দিতে মোটেও দ্বিধা করেন না। এদের মাধ্যমেই শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। তবে এত কিছুর পরও কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী আছেন, যারা দেশের স্বার্থে কাজ করে চলেছেন। তারা দেশের সম্পদ রক্ষায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের দেশপ্রেম ও সমাজের প্রতি অঙ্গীকার তরুণ সমাজকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। সূচিত হয়েছে পরিবর্তনের নবযুগ।

    ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী : ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য; বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়