জেড নিউজ ডেস্ক :
মানুষ সামাজিক জীব। তাই জীবন ও জীবিকার তাগিদে তাদের একে অপরের সঙ্গে মিশতে হয়, ওঠাবসা করতে হয়। সে যাদের সঙ্গে ওঠাবসা করে, ধীরে ধীরে তাদের স্বভাব, চিন্তা ও আচরণ দ্বারাই প্রভাবিত হয়। তাই ইসলাম নেককার ও সৎ মানুষের সংস্পর্শে থাকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কারো সঙ্গে দেখা করা এবং সৎ লোকদের সঙ্গে বসা—এসব আমল ঈমানকে সতেজ রাখে ও জান্নাতের পথ সুগম করে। নিম্নে পবিত্র কোরআনের আলোকে এই বিষয়ে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো—
সৎ ও আল্লাহওয়ালাদের সঙ্গ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে মহান আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-কে সম্বোধন করে সৎ সঙ্গীদের সাহচর্যে থাকার আদেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আপনি নিজেকে ধৈর্যের সঙ্গে তাদের সঙ্গে রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যা তাদের রবকে ডাকে তাঁর সন্তুষ্টি কামনায়।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ২৮)
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)
পক্ষান্তরে মন্দ সঙ্গের পরিণতি কিয়ামতের দিন ভয়াবহ অনুশোচনা হয়ে দেখা দেবে। সেদিন এই বন্ধুত্বের জন্য বান্দার আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন জালিম নিজের হাত কামড়ে বলবে, হায়, আমি যদি রাসুলের সঙ্গে পথ অবলম্বন করতাম! হায় আমার দুর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধু না বানাতাম!’ (সুরা : ফুরকান, ২৫:২৭-২৮)
এখানেই শেষ অসৎ সঙ্গী বা বন্ধু দুনিয়াতে যত আপন হওয়ার ভান করুক না কেন, কিয়ামতের দিন তারাই হবে সবচেয়ে বড় শত্রু। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘সেদিন বন্ধুরা একে অপরের শত্রু হয়ে যাবে, তবে মুত্তাকিরা ছাড়া।’ (সুরা : যুখরুফ, ৪৩:৬৭)
অর্থাৎ আল্লাহভীরুদের বন্ধুত্বই কিয়ামতের দিনও স্থায়ী হবে। তাই জীবনে চলার প্রয়োজনে ওঠাবসা করলে ঈমান-আমল দেখে সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত, যাতে তাকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়। তার সঙ্গে চললে ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বাড়ে।
সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্য হবে, একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি। কারণ কাউকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় ভালোবাসলে, তার সাহচর্যে থাকলে, খোঁজখবর রাখলে এর বিনিময়ে মহান আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া যায়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, এক ব্যক্তি তার ভাইয়ের সাক্ষাতের জন্য অন্য এক গ্রামে গেল। আল্লাহ তাআলা তার জন্য পথিমধ্যে একজন ফেরেশতা নিয়োগ করলেন। সে ব্যক্তি যখন ফেরেশতার কাছে পৌঁছল, তখন ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথায় যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছ? সে বলল, আমি এ গ্রামে আমার এক ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য যেতে চাই। ফেরেশতা বললেন, তার কাছে কি তোমার কোনো অবদান আছে, যা তুমি আরো প্রবৃদ্ধি করতে চাও? সে বলল, না। আমি তো শুধু আল্লাহর জন্যই তাকে ভালোবাসি। ফেরেশতা বললেন, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে (তাঁর দূত হয়ে) তোমার কাছে অবহিত করার জন্য এসেছি যে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন, যেমন তুমি তোমার ভাইকে তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ভালোবেসেছ। (মুসলিম, হাদিস : ৬৪৪৩)
এই হাদিস শেখায়, দুনিয়াবি লাভের আশা ছাড়া শুধু আল্লাহর জন্য সম্পর্ক রাখলে বান্দা আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করে। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে মাঝেমধ্যে মুমিন সহচরদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য সশরীরে তাদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। বিশেষ করে তারা কোনো বিপদে থাকলে কিংবা অসুস্থ হলে তাদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য গেলে জান্নাতের প্রতি অগ্রসর হওয়া যায়।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে লোক আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি হাসিলের আশায় কোনো অসুস্থ লোককে দেখতে যায় অথবা নিজের ভাইয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে যায়, একজন ঘোষক (ফেরেশতা) তাকে ডেকে বলতে থাকেন : কল্যাণময় তোমার জীবন, কল্যাণময় তোমার এই পথ চলাও। তুমি তো জান্নাতের মধ্যে একটি বাসস্থান নির্দিষ্ট করে নিলে। (তিরমিজি, হাদিস : ২০০৮)
তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত, সৎ ও আল্লাহওয়ালা মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ক করা ও বজায় রাখার চেষ্টা করা। কারণ সৎ ও আল্লাহওয়ালা মানুষের সাক্ষাৎ ও সাহচর্য শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি ইবাদত, যার প্রতিদান আল্লাহর ভালোবাসা, ফেরেশতাদের দোয়া এবং জান্নাতের ঠিকানা। এই আমল আমাদের ঈমানকে শক্তিশালী করে, গুনাহ থেকে বাঁচায় এবং কিয়ামতের দিন আরশের ছায়ার সুসংবাদ দেয়।





