spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

তারকাদের বিচ্ছেদ বাড়ছে, ছড়াচ্ছে ভীতি

জেড নিউজ ডেস্ক:

তারকাদের বিয়ে, প্রেম আর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিয়ের খবরের পাশাপাশি তারকাদের বিচ্ছেদের খবরও যেন নিয়মিতই আসছে। একেকটি বিচ্ছেদের খবর ঘিরে স্যোশাল মিডিয়ায় শুরু হয় তুমুল আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা। তেমনি এক প্রশ্নের জন্ম দিয়ে বর্তমানে টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে তারকা জুটি প্রীতম হাসান আর শেহতাজ মুনিরা হাশেমের বিচ্ছেদের খবর।

রোববার (৪ অক্টোবর) রাতে এক যৌথ বিবৃতিতে নিজেদের বিচ্ছেদের খবর জানান তারা। ১০ বছরের এক দীর্ঘ ও সুন্দর সম্পর্ক, যার মধ্যে চার বছরের সংসার। সব যেন নিমিষেই শেষ! ভক্তরা মেনেই নিতে পারছেন না যেন। অন্তর্জালে অনুরাগীরা এই জুটির সুন্দর ও আবেগঘন মুহূর্তগুলো স্মরণ করছেন আর দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন।

এর আগে চলতি বছরই বিচ্ছেদের খবর দিয়ে আলোচনায় আসেন সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা তাহসান খান এবং রোজা আহমেদ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিয়ে করা এই দম্পতির সম্পর্ক নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই নানা গুঞ্জন চলছিল।

পরে তাহসান নিজেই নিশ্চিত করেন, তাদের বিচ্ছেদের ঘটনা সত্য এবং তারা বেশ কিছুদিন ধরেই আলাদা থাকছেন। তবে বিচ্ছেদের নির্দিষ্ট কারণ তখন প্রকাশ্যে আনেননি তিনি।

২০২৬ সালের মার্চে বিচ্ছেদের পথে হাঁটার খবর আসে অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদ ও নাট্যকার আবু সাইয়িদ রানার। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিয়ে করেছিলেন তারা। বিচ্ছেদের খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে মৌসুমী জানিয়েছিলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত বলার মতো অবস্থায় তিনি নেই।

২০২৫ সালেও শোবিজে একাধিক বিচ্ছেদের খবর সামনে আসে। সংগীতশিল্পী দিলশাদ নাহার কণা ও গোলাম মোহাম্মদ ইফতেখারের ছয় বছরের সংসারের ইতি ঘটে ওই বছরের জুনে। কণা নিজেই বিচ্ছেদের কথা জানান।

বছরের শেষ দিকে বিচ্ছেদের খবর আসে সংগীতশিল্পী মৌসুমী আক্তার সালমার সংসারে। ২০১৮ সালে আইনজীবী সানাউল্লাহ নূর সাগরকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর তাদের বিচ্ছেদ হয় বলে সালমা নিজেই নিশ্চিত করেন। তার সাবেক স্বামীও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচ্ছেদের বিষয়টি জানিয়ে বলেন, পারস্পরিক মতের অমিল, চিন্তা ও মানসিকতার দূরত্বই তাদের আলাদা হওয়ার কারণ।

একই বছর প্রকাশ্যে আসে অভিনেতা রাশেদ মামুন অপুর বিচ্ছেদের খবর। সংবাদপাঠিকা মমরেনাজ মোমোর সাথে তার সংসার ভেঙেছিল প্রায় ছয় বছর আগে। তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে।

এর আগে ২০২৪ সালেও শোবিজে একাধিক আলোচিত বিচ্ছেদ ঘটে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি স্বামী রকিব সরকারের সাথে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তের কথা জানান। ২০২১ সালে তাদের বিয়ে হয়েছিল। একই বছরের জুলাইয়ে প্রায় সাড়ে নয় বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানেন অভিনেতা আরিফিন শুভ ও অর্পিতা সমাদ্দার। দুজনের বিচ্ছেদ ছিল পারস্পরিক সিদ্ধান্তে।

আরও আগে আলোচনায় ছিল পরীমণি ও শরিফুল রাজের বিচ্ছেদ। ২০২৪ সালে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আলাদা থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। তাদের বিচ্ছেদের পর সন্তানকে ঘিরে দুজনের যোগাযোগ নিয়েও নানা খবর প্রকাশিত হয়।

তবে শোবিজে বিচ্ছেদের এই তালিকা আরও দীর্ঘ। তাহসান-মিথিলা, নোভা-রায়হান, হাবিব-রেহান, শখ-নিলয়, বাঁধন-সনেট, হৃদয় খান-সুজানা, মিলা-পারভেজ সানজারির মতো আলোচিত জুটির সংসারও বিভিন্ন সময়ে ভেঙেছে। ফলে গত এক দশকে বিনোদন অঙ্গনে বিয়ে ও বিচ্ছেদ দুটোই তারকাদের ব্যক্তিজীবনের আলোচিত অংশ হয়ে উঠেছে।

তারকাদের এমন বিচ্ছেদের খবরে সাধারণ মানুষ কেন এতটা কষ্ট পান বা হতাশ হন, তার একটি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন নিউইয়র্কভিত্তিক সাইকোথেরাপিস্ট ক্যাথরিন শেফলার। ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তার এক প্রবন্ধে তিনি জানান, সেলিব্রিটিদের আমরা একটি ‘পারফেক্ট’ বা নিখুঁত জুটি হিসেবে দেখি। তাদের দেখে আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য শুধু ভালোবাসাই যথেষ্ট।

ক্যাথরিন শেফলরে মতে, যখন এমন ক্ষমতাবান, সুদর্শন, বিত্তবান ও প্রতিভাবান মানুষদের সম্পর্ক ভেঙে যায়, তখন সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। অবচেতন মন ভাবতে শুরু করে, ওদের মতো নিখুঁত মানুষেরাই যখন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারল না, তখন আমরা কীভাবে পারব? ক্যাথরিন মনে করিয়ে দেন, সম্পর্কের ভিত্তি ভালোবাসা হলেও, এটি টিকিয়ে রাখার জন্য কার্যকর যোগাযোগ, প্রতিশ্রুতি এবং আর্থিক ঘনিষ্ঠতা ও আস্থার মতো বাস্তবমুখী স্তম্ভগুলোরও সমান প্রয়োজন রয়েছে।

মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআর-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারকাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও বিচ্ছেদ নিয়ে সাধারণ মানুষের অতিরিক্ত আগ্রহের পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ ব্যাখ্যা করেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও ব্রেকআপ কোচ ড. অ্যান্ড্রিয়া লাইনার। তার মতে, বর্তমান সময়ে তারকা ও ভক্তদের মধ্যে ‘প্যারাসোশ্যাল’ বা একপাক্ষিক সম্পর্কের প্রভাব রয়েছে যা সামাজিক মাধ্যমের সুবাদে তারকাদের নাগাল পাওয়ার সুযোগ বহুগুণ বেড়েছে।

লাইনারের মতে, এসব তারকারা আমাদের জীবনের অনেক বড় বড় লক্ষ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন। তারা দেখতে আকর্ষণীয়, বিত্তশালী এবং সফল; যার ফলে অনেকেই ধরে নেন তারা জীবনের অনেক সমস্যা থেকেই মুক্ত। কিন্তু যখন তারা বিচ্ছেদের মুখে পড়েন, তখন কিছু মানুষ বিভ্রান্ত হয়। কারণ আমরা ভাবি, সাফল্যের এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পর তো তাদের এমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী, তারকাদের এই বিচ্ছেদ ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে নিজেদের সম্পর্কের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে এই বাস্তবমুখী স্তম্ভগুলোকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার। আজকাল দাম্পত্য সম্পর্কে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে মেসেজিং অ্যাপগুলো। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কর্মব্যস্ত থাকায় কিংবা আলাদা শহরে থাকার কারণে সামনাসামনি কথা বলার সময়টুকুও যেন হারিয়ে যাচ্ছে। গদগদ প্রেম থেকে শুরু করে তীব্র ঝগড়া; সবটাই এখন হয় চ্যাটবক্সে। মন খারাপ হলে অনেকেই তা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানান দেন।

একজন আইনজীবী ও সম্পর্ক বিশেষজ্ঞের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের একটি বড় নেতিবাচক দিক হলো, এখানে কোনো কিছুই হারিয়ে যায় না। রাগের মাথায় পাঠানো একটি মেসেজ বহুবছর পরও চাইলেই খুঁজে পাওয়া যায়। যে ক্ষত ভুলে মানুষ হয়তো এগিয়ে গিয়েছিল, পুরোনো কোনো মেসেজ বা ছবি হঠাৎ সামনে এসে তা আবার নতুন করে জাগিয়ে তোলে। আগে সামনাসামনি তর্ক হলে তা সহজেই মিটে যেত, কিন্তু এখন ডিজিটাল স্মৃতিগুলো ক্ষমা করার পথকে কঠিন করে তুলছে।

তাছাড়া, সোশাল মিডিয়ায় অন্যের পরিমার্জিত ও সাজানো জীবনের ছবি দেখে নিজের দাম্পত্য নিয়ে এক ধরনের অবাস্তব প্রত্যাশা ও হতাশা তৈরি হচ্ছে। ছবির পেছনের আসল সত্যিটা না জেনেই নিজের জীবনের সঙ্গে অন্যের তুলনা করার এই প্রবণতাই ক্রমশ মানুষকে একে অপরের থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতে বহুজনের সঙ্গে অবাধ যোগাযোগের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সম্পর্কের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে, যা মজবুত দাম্পত্যকেও তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিচ্ছে নিমিষেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়