জেড নিউজ ডেস্ক :
আজকালকার ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা কী জানেন? ‘বিশ্বাস’। এ খটখটে ডিজিটাল যুগে আমরা কত শত পৃষ্ঠার আইনি চুক্তিনামা সই করি, সিসিটিভি ক্যামেরা বসাই, কত রকমের ট্র্যাকিং অ্যাপ ব্যবহার করি! তাও যেন ঠিক বিজনেস পার্টনার বা কাস্টমারকে শতভাগ বিশ্বাস করে উঠতে পারি না।
অথচ আমাদের এই বাংলায় একটা সময় ছিল, যখন লাল কাপড়ে মোড়ানো একটা হলদেটে কাগজের খাতার ওপর চোখ বুজে ভরসা করেই মানুষ দিব্যি লাখ লাখ টাকার ব্যবসা করে ফেলেছে। বছরের প্রথম দিনে দোকানের মালিকের সামনে খোলা সেই পুরোনো খাতা, একটা বছরের ফেলে আসা লেনদেনের হিসেব, জমে থাকা স্মৃতি, টুকরো সম্পর্ক আর কিছু অসমাপ্ত দেনা-পাওনা। এই ছিল ব্যবসার আসল চাবিকাঠি। আর বিশেষ দিনটির নামই হলো ‘হালখাতা’।
‘হাল’ একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ বর্তমান বা নতুন। আর ‘খাতা’ মানে তো আমরা জানিই—হিসাবের বই। অর্থাৎ, হালখাতা মানে সময়কে নতুন করে শুরু করার প্রতীকী উৎসব। যেখানে শুধু লাভ-ক্ষতির অংক নয়, জড়িয়ে আছে মানুষের সংস্কৃতি আর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ততা।
এই উৎসবের শিকড় কিন্তু আজ বা কালকের নয়; এর ইতিহাস লুকিয়ে আছে প্রায় ৪০০ বছর আগের মুঘল সাম্রাজ্যের ভেতর। ষোড়শ শতকের শেষভাগে, সম্রাট আকবরের সময়ে বাংলার অর্থনীতি ছিল পুরোপুরি কৃষিনির্ভর। কিন্তু তখনকার হিজরি বা চন্দ্র পঞ্জিকা আমাদের ঋতুচক্রের সঙ্গে মিলত না। ফলে দেখা যেত ফসল কাটার আগেই কর দেয়ার সময় হয়ে গেছে! কৃষকরা পড়ত মহাবিপাকে।
এই সমস্যার সমাধান করতে সম্রাট আকবর সূর্যভিত্তিক একটি নতুন পঞ্জিকা চালু করলেন। আর সেই নতুন পঞ্জিকার প্রথম দিনটাকেই আজ আমরা চিনি ‘পহেলা বৈশাখ’ নামে।
নিয়ম ছিল, চৈত্র মাসের শেষ দিনে পুরোনো সব দেনা-পাওনা মিটিয়ে ফেলা হতো। আর বৈশাখের প্রথম দিনে খোলা হতো নতুন হিসাবের খাতা। জমিদাররা প্রজাদের ডেকে আনতেন, খাজনা আদায়ের পর তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে সূচনা হতো নতুন বছরের। এই রাজকীয় প্রথাই কালক্রমে আমাদের ব্যবসায়ী বা বণিক সমাজে প্রবেশ করে এবং রূপ নেয় ‘হালখাতা’ নামের ঐতিহ্যে।
কিন্তু কালচক্র থেমে থাকে না। ডিজিটাল প্রযুক্তির আগমনে সেই লাল কাপড়ের কাগজের খাতার জায়গা আজ দখল করে নিয়েছে কম্পিউটার, এক্সেল শিট আর কুইক বুকিং সফটওয়্যার। হিসাব এখন অনেক দ্রুত, নির্ভুল। এই ডিজিটালাইজেশনের চাদরে আমাদের হালখাতা আজ বড্ড ম্লান।
তবুও, শেকড়ের টানে আজো বাংলাদেশের মফস্বল বা গ্রাম কিংবা পুরান ঢাকার গুটিকয়েক গলিতে ছোট করে হলেও হালখাতা বসে। হয়তো সেই আগের মতো জাঁকজমক আর নেই, কিন্তু সেই পুরোনো অনুভূতির টানটা আজো কোথাও না কোথাও রয়ে গেছে।



