জেড নিউজ, ঢাকা:
দরজায় কড়া নাড়ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। আর এ বৈশাখ মানে বাংলার চিরচেনা এক ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘পান্তাভাত’। এটি ছিল একসময় গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাদামাটা এই খাবারই এখন নতুনভাবে পুষ্টিবিদদের আলোচনায় উঠে এসেছে।
অনেকেই ভাবেন, আগের দিনের ভাত ভিজিয়ে খাওয়া মানেই শুধু স্বাদের বিষয়, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে শরীরের জন্য উপকারী নানা বৈজ্ঞানিক দিক। কিন্তু সারাদিন ভিজিয়ে রাখার ফলে তৈরি হওয়া এই খাবারটি কীভাবে পুষ্টিগুণে ভরপুর হয়ে ওঠে, আবার কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারে ঝুঁকি, এসব না জেনে খেলে উপকারের বদলে ক্ষতিও হতে পারে। তাই পান্তাভাত মুখে তোলার আগে জেনে নেওয়া জরুরি এর অজানা কিছু সত্য।
সাধারণত ভাত ৮-১২ ঘণ্টা পানিতে ডুবিয়ে রাখলে এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ফারমেন্টেশন বা গাজন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সময় ভাত সরাসরি অক্সিজেনের সংস্পর্শে থাকে না, ফলে এর ভেতরে থাকা কার্বোহাইড্রেট ভেঙে যায় এবং ফাইটেটের মতো অ্যান্টি-নিউট্রিশনাল উপাদানগুলোর কার্যকারিতা কমে আসে। একই সঙ্গে ভাত পানি শোষণ করে আরও নরম ও হাইড্রেটেড হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ার ফলে পান্তাভাতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, জিংক, ফসফরাস ও ভিটামিন বি-এর পরিমাণ বেড়ে যায়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১০০ মিলিগ্রাম সাধারণ ভাতে যেখানে আয়রন থাকে প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম, সেখানে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা পান্তাভাতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩ দশমিক ৯ মিলিগ্রামে। একইভাবে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ২১ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে প্রায় ৭৮৫ মিলিগ্রাম হয়। পটাশিয়ামের ক্ষেত্রেও দেখা যায় বড় পার্থক্য, সাদা ভাতে ৭৭ মিলিগ্রাম থাকলেও পান্তাভাতে তা প্রায় ৭৯৯ মিলিগ্রাম।
এছাড়া ম্যাগনেশিয়াম ও জিংকের উপস্থিতিও পান্তাভাতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকে। আরেকটি তথ্য অনুযায়ী, পান্তায় আয়রনের পরিমাণ প্রায় ৬৮ দশমিক ৭ মিলিগ্রাম, যেখানে সাদা ভাতে থাকে মাত্র ২ দশমিক ৯ মিলিগ্রাম। ফলে রক্তশূন্যতা কমাতে পান্তাভাত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকেরা জানান, সাধারণ ভাতে থাকা ফাইটেট নামের উপাদানটি আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে বেঁধে রাখে, যার কারণে শরীর সহজে এসব শোষণ করতে পারে না। কিন্তু ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়ায় ফাইটেট দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে পুষ্টিগুলো মুক্ত হয়ে শরীরের জন্য সহজলভ্য হয়ে ওঠে।
শুধু তাই নয়, গাজানো পান্তাভাতে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণও বেড়ে যায়, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং হজমশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। এতে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড ও বিভিন্ন মেটাবলাইট শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়ক এবং ক্যানসার প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, পান্তাভাত খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলক ধীরে বাড়ে, যা স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসে এটি একটি সম্ভাবনাময় সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সতর্কতা
তবে পান্তাভাত খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ভাত ফারমেন্টেড হলে এতে অ্যালকোহল তৈরি হতে পারে, যা পেটের সমস্যা বা ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি বা অতিরিক্ত ওজনের মানুষদের নিয়মিত পান্তাভাত খাওয়ার আগে সতর্ক থাকা উচিত।
এছাড়া পান্তা তৈরির সময় যদি অপরিষ্কার পাত্র বা দূষিত পানি ব্যবহার করা হয়, তাহলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।



