আমিরুল ইসলাম কাগজী
বাংলাদেশকে চাপে রাখতে অভিন্ন নদ-নদীর পানিকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ভারত। এমন অভিযোগ এখন আর কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং সরকারি দপ্তর, বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের বিশ্লেষণেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে বাংলাদেশ বারবার কূটনৈতিক চ্যানেলে চিঠি দিলেও দিল্লির পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো সাড়া মিলছে না।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও যৌথ নদী কমিশন-জেআরসি সূত্র জানায়, শুষ্ক মৌসুমে ভারত উজানে অবৈধভাবে পানি প্রত্যাহার করছে, আবার বর্ষায় হঠাৎ বাঁধ খুলে দিয়ে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করছে। এসব বিষয়ে বারবার চিঠি ও বৈঠকের আহ্বান জানানো হলেও ভারত উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় বসতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
জেআরসি সূত্র অনুযায়ী, সর্বশেষ ৯ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে কারিগরি বৈঠকে পদ্মা, তিস্তা ছাড়াও ধরলা, দুধকুমার, গোমতী, মনু, খোয়াই ও মুহুরীসহ ১৪টি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা হয়। তবে বৈঠকের পর থেকে ভারত কার্যত সব যোগাযোগ এড়িয়ে চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি বলবৎ থাকা অবস্থায়ও বাংলাদেশ ন্যায্য পানি পাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ফারাক্কা ব্যারাজসহ গঙ্গা অববাহিকায় সাতটি ক্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক পানি একতরফাভাবে সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। গঙ্গার ওপর অন্তত ৩৩টি বড় অবকাঠামো নির্মাণ করে সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
তিস্তা নদীর পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। শুষ্ক মৌসুমে যেখানে ন্যূনতম ১০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা, সেখানে বাংলাদেশ পাচ্ছে মাত্র ২০০ কিউসেকেরও কম। ফলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ভয়াবহ সংকটে পড়েছে।
ভারতের এমন পদক্ষেপের কারণে এখনই বাংলাদেশের কোনো কোনো এলাকায় মরুময়তা দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরো মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে পানি কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক সম্পদ নয়—এটি ক্ষমতা, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের এক নীরব কিন্তু গভীর অস্ত্র। বিশেষ করে নদীমাতৃক বাংলাদেশে পানির প্রশ্ন মানেই জীবন, কৃষি, অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, ভারত বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারে পানিকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি সরাসরি আগ্রাসন নয়, বরং কূটনৈতিক চাপে বাঁধা এক সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ—যাকে আধুনিক পরিভাষায় বলা যায় হাইড্রো-হেজেমনি।
১. নদীর দেশ, নির্ভরতার দেশ
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা তাকে স্বাভাবিকভাবেই পানিনির্ভর ও প্রতিবেশী-নির্ভর করে তুলেছে। প্রায় ৫৪টি অভিন্ন নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই নদীগুলোর উৎস, প্রবাহ ও নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ ভারতের ভূখণ্ডে। ফলে উজানের দেশ হিসেবে ভারত স্বাভাবিকভাবেই এক প্রভাবশালী অবস্থানে। কিন্তু এই প্রভাব যখন পারস্পরিক ন্যায় ও আন্তর্জাতিক নীতির বাইরে গিয়ে একতরফা নিয়ন্ত্রণে রূপ নেয়, তখন তা কূটনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়।
বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, এমনকি পরিবেশগত ভারসাম্য—সবকিছুই নদীপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি আর বর্ষায় হঠাৎ অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়া—এই দুই চাপে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই ভুগছে।
২. ফারাক্কা থেকে তিস্তা: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক
পানিকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের ইতিহাস নতুন নয়। ফারাক্কা ব্যারাজ তার সবচেয়ে বড় প্রতীকী উদাহরণ। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা চালুর পর থেকেই গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। বাংলাদেশে নাব্যতা কমে, কৃষিজমি লবণাক্ত হয়, পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দেয়। ১৯৯৬ সালে গঙ্গা চুক্তি হলেও বাস্তবে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ তার ন্যায্য হিস্যা পায়নি—এ অভিযোগ আজও অমীমাংসিত।
তিস্তা নদী নিয়ে পরিস্থিতি আরও স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক। বহু বছর ধরে তিস্তা চুক্তির কথা বলা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। দিল্লি–ঢাকা সমঝোতা থাকলেও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের আপত্তিকে অজুহাত বানিয়ে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ এই নদীর পানির ওপর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লাখো কৃষকের জীবন নির্ভরশীল।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে—যদি বন্ধুত্ব ও অংশীদারিত্বই লক্ষ্য হয়, তবে একটি ন্যায্য পানিচুক্তি এত বছরেও কেন বাস্তবায়ন হয় না?
৩. পানি ও ক্ষমতার রাজনীতি: হাইড্রো-হেজেমনি
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বে “হাইড্রো-হেজেমনি” বলতে বোঝায়—উজানের দেশ তার ভৌগোলিক সুবিধাকে ব্যবহার করে ভাটির দেশকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে প্রভাবিত করা। ভারতের আচরণ অনেক ক্ষেত্রে এই তত্ত্বের সঙ্গে মিলে যায়।
একদিকে সীমান্তে কড়াকড়ি, অন্যদিকে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ—এই দ্বিমুখী চাপ বাংলাদেশকে এক ধরনের কৌশলগত নির্ভরতার মধ্যে আটকে রাখে। পানি এখানে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি আলোচনার টেবিলে চাপ সৃষ্টির উপাদান। বাণিজ্য, ট্রানজিট, নিরাপত্তা সহযোগিতা—সবকিছুর সঙ্গে পানির প্রশ্ন অঘোষিতভাবে জড়িয়ে থাকে।
৪. অবকাঠামো রাজনীতি ও একতরফা উন্নয়ন
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একের পর এক ড্যাম, ব্যারাজ ও নদীশাসন প্রকল্প গড়ে উঠছে। এগুলোর অনেকগুলোর ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে যথাযথভাবে অবহিত করা হয় না, কিংবা পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নে বাংলাদেশের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
উজানে পানি ধরে রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা সেচ সুবিধা বাড়ানো ভারতের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের অংশ হতে পারে, কিন্তু এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ভাটির দেশ বাংলাদেশে। আন্তর্জাতিক নদীনীতিতে “ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ব্যবহার” এবং “ক্ষতি না করার বাধ্যবাধকতা” থাকলেও বাস্তবে সেগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত।
৫. কূটনীতিতে অসমতা ও নীরবতা
বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে প্রায়ই “বন্ধুত্বপূর্ণ” বলা হয়। কিন্তু কূটনীতিতে বন্ধুত্ব তখনই অর্থবহ হয়, যখন শক্তির ভারসাম্য না থাকলেও ন্যায়বিচার থাকে। পানির প্রশ্নে বাংলাদেশ বহু ক্ষেত্রেই নীরব বা সংযত থেকেছে—এর পেছনে কূটনৈতিক বাস্তবতা, আঞ্চলিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা হিসাব কাজ করেছে।
তবে এই নীরবতার সুযোগ নিয়েই ভারত পানির প্রশ্নকে চাপের উপকরণে রূপান্তর করছে—এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। যখন সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগের সঙ্গে পানির সংকট যুক্ত হয়, তখন সামগ্রিক সম্পর্ক একতরফা বলেই প্রতীয়মান হয়।
৬. পানি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব
পানি কেবল উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা—সবকিছুই পানির সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘমেয়াদে পানির ঘাটতি সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা একটি দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণকেও প্রভাবিত করে।
এই প্রেক্ষাপটে পানিকে হাতিয়ার বানানো মানে সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তিকে দুর্বল করা।
৭. বিকল্প কূটনীতি ও বহুমুখী সম্পর্কের প্রয়োজন
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—পানিকেন্দ্রিক কূটনীতিতে একক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা। এর অর্থ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়; বরং সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুপাক্ষিক করা।
আন্তর্জাতিক ফোরাম, আঞ্চলিক সংস্থা, জাতিসংঘের পানি আইন—এসব প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনা, নদী খনন, সংরক্ষণ ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলতে হয় বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভূগোলের কারণে অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু এই সম্পর্ক টেকসই হতে হলে শক্তির নয়, ন্যায়ের ভিত্তিতে দাঁড়াতে হবে। পানি কোনো দেশের একক সম্পত্তি নয়—বিশেষ করে যখন তা সীমান্ত ছাড়িয়ে বহমান।
ভারত যদি সত্যিই বাংলাদেশকে বন্ধু ও অংশীদার হিসেবে দেখতে চায়, তবে পানিকে চাপের হাতিয়ার না বানিয়ে সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাধান খুঁজতে হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশকেও কূটনৈতিক দৃঢ়তা, আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার পথকে আরও সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে হবে।



