ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী
পশ্চিমা বিশ্বের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেছেন, ‘তৃতীয় বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে নানা জটিল সমস্যা বিরাজমান। যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় তাদের ওপর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে অনেক বেশি। কারণ তারা নানা ধরনের অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণকে প্রলুব্ধ করে ভোট আদায় করে নেয়। কিন্তু বাস্তবসম্মত কারণেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পক্ষে গণচাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে অল্প দিনের মধ্যেই সাধারণ মানুষের মোহ ভঙ্গ হয়। তারা পরবর্তী নির্বাচনে নতুন কোনো রাজনৈতিক দলকে ভোট দিয়ে ক্ষমতাসীন করে। সম্ভাবনাময় নতুন কোনো রাজনৈতিক দল না পাওয়া গেলে তারা আবারও সেই পুরোনো রাজনৈতিক দলকেই ভোট দেয়।’
বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে আমরা ওই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর বক্তব্যের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারব। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে যতটি স্বচ্ছ, সুষ্ঠু এবং জন অংশগ্রহণমূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার কোনোটিতেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল জয়লাভ করতে পারেনি। পঞ্চম (১৯৯১) ষষ্ঠ (১৯৯৬) সপ্তম (২০০১) এবং অষ্টম (২০০৮) জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচন, যা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। এ চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনোটিতেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল জয়লাভ করতে পারেনি। অর্থাৎ কোনো রাজনৈতিক দল পরপর দুবার সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়নি। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অধীনে বাংলাদেশে কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য হতে পারে না তা একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। অনির্বাচিত সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান একটি জাতির জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কারণ এতে প্রতীয়মান হয় যে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো জনআস্থা অর্জন করতে পারেনি। তাই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য নানা ফন্দি-ফিকিরে লিপ্ত হয়। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের মধ্যেই স্ববিরোধিতা প্রত্যক্ষ করা যায়। তারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগে গণতন্ত্রের কথা বলেন, জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতি দেন; কিন্তু একবার ক্ষমতায় বসতে পারলে সবকিছু ভুলে যান এবং হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য সচেষ্ট হন।
আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে সরকার গঠন করে, যদিও সেই নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সংশয় ছিল। বিএনপি যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারে সে জন্য সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নানাভাবে চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ ছিল। তারপরও জনগণ সেই নির্বাচনের রায়কে মেনে নিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার জন্য প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করে। তারা নানাভাবে প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোকে ধ্বংস করার জন্য সচেষ্ট হয়। প্রতিবাদী মানুষের মুখ বন্ধ করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালানো হয়। গুম, খুনের রাজনীতির মাধ্যমে দেশকে স্বৈরাচারীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করেন। তারা খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারে সুষ্ঠু, সুন্দর এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তারা কোনোভাবেই আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হতে পারবে না। তাই ২০১১ সালে বিচারিক আদালতকে ব্যবহার করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাদ দেয়। আওয়ামী লীগ এতটাই ক্ষমতা লিপ্সু হয়ে ওঠে যে তারা আজীবন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন থাকার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তাদের কোনো কোনো নেতা এমন মন্তব্যও করতেন, আওয়ামী লীগকে আগামী ১০০ বছরেও কেউ ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে না।
দেশ এবং দেশের স্বাধীনতাকে তারা একটি পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও অর্জন বলে প্রচার করতেন।
আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও রাষ্ট্র এবং সরকার নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে। সাধারণভাবে মানুষ মনে করে, রাষ্ট্র এবং সরকারের অস্তিত্ব একই। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সম্পত্তি মানে সরকারের সম্পত্তি। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। এছাড়া জনগণ তাদের আইনসংগত অধিকার সম্পর্কেও জ্ঞাত নয়। রাষ্ট্র বিজ্ঞানের পরিভাষায় ৪টি মৌলিক উপাদানের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়। এরই মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনগণ এবং সরকার। এর মধ্যে একমাত্র পরিবর্তনশীল এবং দুর্বলতম উপাদান হচ্ছে সরকার। সরকার পরিবর্তিত হলেও রাষ্ট্রের অন্য তিনটি উপকরণ কখনোই পরিবর্তিত হয় না। সরকার কোনোভাবেই রাষ্ট্রের মালিক নয়। সরকার হচ্ছে জনগণের পক্ষ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত আমানতদার মাত্র। রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হচ্ছেন জনগণ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনগণ না চাইলে কারও পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। সরকার এমনভাবে জনগণকে মোহগ্রস্ত করে রাখে যেন তারা তাদের অধিকার সম্পর্কে জানতে এবং বুঝতে না পারে। তাই তৃতীয় বিশ্বের সরকারগুলো কখনোই চান না দেশের মানুষ তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠুক। জ্ঞানভিত্তিক আলোকিত সমাজ গঠনে সরকার কার্যকর ভূমিকা পালন করে না। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। জনগণ যেহেতু তাদের অধিকার এবং কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন নন, তাই তারা উপযুক্ত পাত্রে ভোট দিয়ে কল্যাণকর সরকার গঠনের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ সময় ব্যর্থ হন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশের এ নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটারদের উপযুক্ত এবং সঠিক প্রার্থী বেছে নিতে হবে, যারা দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করতে পারবে। জনগণের ভোটের মাধ্যমে দৃশ্যমান হবে বাংলাদেশ কি আলোকজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে যাত্রা শুরু করবে নাকি আবারও স্বৈরাচারের অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে লন্ডন প্রবাসী বাংলাদেশি এক বুদ্ধিজীবী পত্রিকায় লিখেছিলেন, এবার ব্যক্তি দেখে নয়, মার্কা দেখে ভোট দিন। তার এ বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। ভোটদানের সময় একজন ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ভালোভাবেই যাচাই-বাছাই করতে হবে।
নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলের চেয়ে ব্যক্তিকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ দল কখনো একজন ব্যক্তিকে মহিমান্বিত বা কলুষিত করতে পারে না। বরং ব্যক্তির নানা অন্যায় কর্মের কারণেই দল বিপর্যস্ত হয়। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আমাদের সমর্থন থাকতেই পারে। কিন্তু তাই বলে দল যদি অযোগ্য এবং দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেয় তাহলে তাকেই ভোট দিতে হবে এমনটা ভাবা ঠিক নয়। আশির দশকে সামরিক শাসক এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে, ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’-এ ধরনের স্লোগান অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। কিন্তু এ স্লোগানটি মোটেও বাস্তব সম্মত নয়। কারণ ভোট হচ্ছে পবিত্র আমানত। তাই স্লোগানটি হওয়া উচিত ছিল, ‘আমার ভোট আমি দেব, যোগ্য লোক দেখে দেব।’ ভোট হচ্ছে আমানত, কাজেই সেই আমানতের সঠিক ব্যবহার করাটাই কাম্য। আমরা যদি উপযুক্ত ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে আমাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে ব্যর্থ হই তাহলে সেই ব্যক্তি যত অপকর্ম করবেন তার ‘দায়’ কিছুটা হলেও সংশ্লিষ্ট ভোটারের ওপর বর্তাবে। কারণ তার সমর্থন পেয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করতে না পারলে তার পক্ষে অন্যায় কর্ম করা সম্ভব হতো না। আবার কোনো ভালো এবং যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে তিনি যে সৎ কর্ম করবেন তার অংশীদার সংশ্লিষ্ট ভোটারও হবেন। কাজেই ভোটদানের ক্ষেত্রে ভোটারদের সচেতনতাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভোটাররা যদি সঠিক ব্যক্তিকে ভোট দিতে সক্ষম হন তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোও যেনতেন ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার সুযোগ পাবেন না।
বাংলাদেশ যারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন তাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী অথবা সমর্থক। তারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো প্রার্থীকে নির্বাচনে সাধারণত ভোট প্রদান করেন না। ভোটারদের যদি সচেতনভাবেই দলমতের ঊর্ধ্বে উপযুক্ত এবং সঠিক ব্যক্তিকে নির্বাচিত করতে পারেন শুধু তাহলেই আমরা ভালো সরকার পেতে পারি। ভোটারদের একটি বড় অংশ রয়েছেন যারা কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সমর্থক নন। অনেক সময় এ ধরনের ভোটাররা নির্বাচনি ফলাফল নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ একজন মানুষকে পরিণত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারঙ্গম করে তোলে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা একজন মানুষের সুকুমার বৃত্তিকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে তেমন একটা অবদান রাখতে পারছে না। ফলে উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিরাও অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হন। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই অশিক্ষিত অথবা স্বল্পশিক্ষিত। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রায়শই ভুল করে থাকেন।
নির্বাচনের সময় সব শ্রেণিপেশার ভোটাররা একই রকম মর্যাদা পেয়ে থাকেন। উচ্চ শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত উভয় ব্যক্তির ভোটের গুরুত্ব একই রকম। সমাজে সবচেয়ে শিক্ষিত এবং বিত্তবান ব্যক্তির ভোটের যে গুরুত্ব, সবচেয়ে নিুস্তরে বসবাসকারী ব্যক্তির ভোটেরও একই গুরুত্ব। নির্বাচনে উপযুক্ত প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যদি সতর্কতা অবলম্বন করা না যায়, তাহলে সঠিক প্রার্থীকে নির্বাচিত করা সম্ভব হয় না। আলোকিত এবং জ্ঞানদীপ্ত সমাজ ব্যবস্থায় ভোটাররা উপযুক্ত প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অধিকতর সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আমাদের সমাজব্যবস্থা এখনো অন্ধকারে আচ্ছন্ন। যারা প্রতিবছর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করে বেরুচ্ছে তাদের মধ্যে কতজন প্রকৃত শিক্ষিত তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যারা ভোটার, নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে বাড়িয়ে তুলতে না পারলে তারা উপযুক্ত প্রার্থীকে ভোট দিয়ে সংসদে প্রেরণ করতে পারবেন না। আমাদের দেশে ভোটারদের প্রশিক্ষিত করে তোলার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের কর্মীদের প্রশিক্ষিত করে তুলতে পারতেন তাহলে তারা তৃণমূল পর্যায়ে ভোটারদের উপযুক্ত প্রার্থীকে ভোটদানের ক্ষেত্রে সক্ষম করে গড়ে তুলতে পারতেন। আগে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের কর্মীদের জন্য নিয়মিত পড়াশোনা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করত। ফলে কর্মীদের মধ্যে জ্ঞানালোক বিকশিত হতো। তারা সেই জ্ঞান সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করতে পারত। কিন্তু এখন অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই কর্মীদের পড়াশোনার ব্যাপারে কোনো তাগিদ দেয় না। অনেকেই আছেন যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী। কিন্তু তারা তাদের দলের কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত নন। আগামীতে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মীদের পাশাপাশি জনগণকে প্রশিক্ষিত করার উদ্যোগ নিতে পারেন।
মানুষের মাঝে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে জ্ঞানভিত্তিক আলোকিত সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক। উন্নত দেশগুলোতে ভোটাররা জ্ঞানালোকিত সমাজে বসবাস করেন। তারা সুচিন্তিতভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। কিন্তু আমাদের মতো দেশের ভোটাররা যুক্তির চেয়ে আবেগ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে থাকেন। ফলে তারা বেশিরভাগ সময় সঠিক ব্যক্তিকে নির্বাচিত করতে পারেন না। একশ্রেণির ভোটার আছেন যারা সাময়িক ব্যক্তি স্বার্থে নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে থাকেন। এতে দেশ ও সমাজের যে কতটা ক্ষতি হয় তা তারা বুঝতে পারেন না। নির্বাচনে ঋণ খেলাপি, অর্থ পাচারকারী, দুর্নীতিবাজদের বয়কট করতে হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক চরিত্র পরিবর্তন করতে হলে সৎ এবং যোগ্য লোকদের বেশি বেশি রাজনীতিতে আসতে হবে। যারা নির্বাচনে ভোট প্রয়োগ করেন তারা যদি সতর্ক এবং সচেতন না হয় তাহলে কোনোভাবেই রাজনীতির শ্রেণি চরিত্র পরিবর্তিত হবে না। যারা ভোটার তারা যদি পার্টির প্রতি অতি আবেগের বশবর্তী না হয়ে যোগ্য এবং উপযুক্ত ব্যক্তিকে ভোট প্রদান করেন তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনে যেনতেন প্রার্থী নমিনেশন দিতে পারবেন না। অর্থাৎ যারা ভোটার তারাই প্রেসার গ্রুপ হিসাবে কাজ করতে পারেন। জনগণকে তাদের ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে হবে। ক্ষমতাপ্রয়োগের ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে। সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত করার ক্ষমতা জনগণের হাতে। সরকার যদি বুঝতে পারে যে কোনো উপায়ে সাধারণ মানুষকে সন্তুষ্ট করা যাবে না তাহলে তারা গণচাওয়া মোতাবেক তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে উদ্যোগী হবেন।
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সাধারণ গতানুগতিক কোনো নির্বাচন নয়। এটা জাতির ভাগ্য নির্ধারণী একটি নির্বাচন। আমরা যদি সরকার গঠনে ভুল করি তাহলে তার খেসারত আমাদের দিতে হবে। নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সঠিক ব্যক্তিকে বেছে নিতে হবে। কাউকে ভোটদানের আগে তার ব্যক্তিগত জীবন, সততা, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। ঋণ খেলাপি, অসৎ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি যাতে নির্বাচিত না হতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। হঠাৎ করে এসে জুড়ে বসা কোনো ব্যক্তিকে ভোট না দিয়ে পরীক্ষিত সৎ ব্যক্তি, যারা দীর্ঘদিন নিঃস্বার্থভাবে জনসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন তাদের নির্বাচিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
লেখক : সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত



