শিক্ষাবিদ অধ্যাপক দিলারা হাফিজ: এক নীরব আলোর নিভে যাওয়া
আমিরুল ইসলাম কাগজী:
মানুষের জীবন কখনও কখনও এতটাই নিভৃত অথচ এতটাই দীপ্তিময় হয় যে, তার প্রস্থান কোনো ব্যক্তিগত শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি সমাজের, একটি প্রজন্মের, এমনকি একটি জাতির নীরব বেদনা। অধ্যাপক দিলারা হাফিজ ছিলেন তেমনই এক আলোকিত নাম। তিনি ছিলেন একজন দায়িত্বশীল শিক্ষাবিদ, একজন স্নেহময়ী মা, একজন প্রজ্ঞাবান সহধর্মিণী, এবং সর্বোপরি—একটি মূল্যবোধনিষ্ঠ জীবনের প্রতীক। তাঁর মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার শোকাহত হয়নি; শোকাহত হয়েছে শিক্ষা, শালীনতা, সংস্কার ও মানবিকতার এক পরম পরিসর।
আজ যখন তাঁর মৃত্যুসংবাদ আমাদের কানে আসে, তখন হৃদয়ের ভেতর কোথাও এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। কারণ, কিছু মানুষ আছেন যাঁরা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও চারপাশকে আলোকিত করেন। তাঁরা প্রচারের মানুষ নন, তাঁরা প্রভাবের মানুষ। তাঁরা মঞ্চের সামনে দাঁড়ান না, কিন্তু মঞ্চ নির্মাণের পেছনে তাঁদের নীরব শ্রম থাকে। অধ্যাপক দিলারা হাফিজ ছিলেন তেমনই এক অনাড়ম্বর দীপশিখা।
আজকের সব সংবাদ মাধ্যম এবং পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হবে যে,জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সহধর্মিণী অধ্যাপক দিলারা হাফিজ ইন্তেকাল করেছেন। কিন্তু তাঁর পরিচয়ের মূলভিত্তি কখনও কেবল রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হওয়া ছিল না। বরং তিনি নিজস্ব যোগ্যতা, প্রজ্ঞা ও কর্মনিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন স্বতন্ত্র মর্যাদা। একজন শিক্ষক যখন শুধু পাঠ্যবই পড়ান না, বরং মানুষ গড়েন—তখন তিনি সমাজের স্থপতি হয়ে ওঠেন। দিলারা হাফিজ ছিলেন সেই অর্থে একজন সত্যিকারের শিক্ষক; যিনি হয়তো অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর জীবনে শুধু জ্ঞানের আলোই দেননি, দিয়েছেন সাহস, শৃঙ্খলা, রুচি, বিবেক ও আত্মমর্যাদার শিক্ষা।এর পাশাপাশি তিনি ছিলেন শিক্ষাপ্রশাসক, নীতিনির্ধারক এবং নারী শিক্ষার অনুপ্রেরণাদায়ী পথিকৃৎ। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শ্রেণিকক্ষ থেকে শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত নিজস্ব দক্ষতা, সততা, প্রজ্ঞা ও মানবিক নেতৃত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, নারীশিক্ষা বিস্তার এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন কেবল একজন সফল শিক্ষাবিদের জীবনগাথা নয়; এটি এক সংগ্রামী, মেধাবী ও দায়িত্বশীল নারীর অনন্য দৃষ্টান্ত।
অধ্যাপক দিলারা হাফিজ এমন এক সময়ে বেড়ে ওঠেন, যখন বাঙালি সমাজে নারীদের উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত প্রতিষ্ঠা আজকের মতো সহজ ছিল না। সেই বাস্তবতায় তিনি শিক্ষাকে জীবনের প্রধান শক্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, অধ্যবসায়ী এবং আত্মমর্যাদাবোধে দৃঢ়। পরিবারে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও মূল্যবোধ তাঁর চিন্তা-চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলে। অল্প বয়সেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন—শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির পথ নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনেরও সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ধারাবাহিক সাফল্যের মাধ্যমে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন একজন সুসংগঠিত, মননশীল এবং দায়িত্ববান শিক্ষার্থী হিসেবে। তাঁর এই প্রাথমিক ভিত্তিই পরবর্তীকালে তাঁকে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপদে নিয়ে যায়।
অধ্যাপক দিলারা হাফিজের উচ্চশিক্ষা ছিল তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানো অধ্যায়। তিনি সাহিত্য, মানবিক মূল্যবোধ, শিক্ষাবিজ্ঞান এবং সমাজ-বাস্তবতার প্রতি গভীর অনুরাগ নিয়ে নিজের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেন। শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুদূরপ্রসারী—তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার লক্ষ্য কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল নয়; বরং জাগ্রত বিবেক, যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা এবং মানবিক চরিত্র গঠন।
শিক্ষাজীবনে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে নিজস্ব বোধ তৈরি করেন। এই বিস্তৃত চিন্তার জগৎ তাঁকে পরিণত করে একজন ‘শিক্ষক’ থেকে ‘শিক্ষানেতা’-তে।
শিক্ষকতা জীবনের সূচনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে দিলারা হাফিজ তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন সরকারি ইডেন কলেজে প্রভাষক হিসেবে। একজন তরুণ শিক্ষক হিসেবে তিনি দ্রুতই শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও সহকর্মীদের আস্থা অর্জন করেন। তাঁর ক্লাস ছিল প্রাঞ্জল, সুসংগঠিত এবং অনুপ্রেরণামূলক। তিনি শুধু পাঠদান করতেন না; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ-চিন্তার বীজ বপন করতেন।
শুধু দক্ষ শিক্ষক হিসেবেই নয়, তিনি খুব দ্রুত একজন সফল প্রশাসক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। যার ফলশ্রুতিতে যেখানে তার কর্ম জীবন শুরু সেই সরকারি ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি ছিল তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দেশের নারী শিক্ষার ইতিহাসে ইডেন কলেজ একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়া যেমন সম্মানের, তেমনি চ্যালেঞ্জেরও। অধ্যাপক দিলারা হাফিজ দক্ষতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেন। এরপর
তিনি সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তাঁর অভিজ্ঞতা এখানে নতুন মাত্রা পায়। সোহরাওয়ার্দী কলেজে তিনি শুধু নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসনই চালু করেননি, বরং শিক্ষকদের মধ্যে দায়িত্ববোধ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলাপূর্ণ শিক্ষা-পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
এখানেও তিনি প্রমাণ করেন—প্রতিষ্ঠান বড় কথা নয়; নেতৃত্ব যদি দক্ষ হয়, তবে যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত করা সম্ভব।
শিক্ষা ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)।
অধ্যাপক দিলারা হাফিজের কর্মজীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলোর একটি হলো জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন। এই পদে থেকে তিনি দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও সংশোধন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।শিক্ষাকে সময়োপযোগী করা, জাতীয় চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া, নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি বিকাশে সহায়ক বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তিনি বিশেষ মনোযোগী ছিলেন বলে শিক্ষা অঙ্গনে তাঁর নাম সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর শিক্ষকদের সর্বশেষ কিংবা বলা যায় সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান ।
অধ্যাপক দিলারা হাফিজ সেই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এটি দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার প্রশাসনিক তদারকির অন্যতম শীর্ষ পদ। এই পদে থেকে তিনি নীতিমালা বাস্তবায়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, মানোন্নয়ন, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।
অধ্যাপক দিলারা হাফিজ ছিলেন দৃঢ়চেতা, মার্জিত, নীতিনিষ্ঠ এবং কর্মমুখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর মধ্যে একসঙ্গে ছিল শৃঙ্খলা ও মানবিকতা, কঠোরতা ও মমত্ব, প্রজ্ঞা ও বাস্তববোধ। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল প্রশাসক; শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন স্নেহময়ী কিন্তু নীতিতে অটল শিক্ষক।
শেষ জীবন ও প্রস্থান
জীবনের দীর্ঘ কর্মময় পথ অতিক্রম করে অধ্যাপক দিলারা হাফিজ শেষ সময় পর্যন্ত শিক্ষা অঙ্গনের মানুষের স্মৃতিতে সম্মানের আসনে ছিলেন। তাঁর প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও অবদান তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। জীবনের শেষ অধ্যায়ে শারীরিক অসুস্থতা থাকলেও তাঁর কর্মজীবনের দীপ্তি ম্লান হয়নি।
আজ তাঁর প্রস্থান দেশের শিক্ষা অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। একজন শিক্ষক চলে গেলে একটি শ্রেণিকক্ষ শূন্য হয়; একজন শিক্ষাপ্রশাসক চলে গেলে একটি প্রতিষ্ঠান শূন্য হয়; কিন্তু অধ্যাপক দিলারা হাফিজের মতো মানুষ চলে গেলে একটি প্রজন্মই যেন কিছুটা অনাথ হয়ে পড়ে।
অধ্যাপক দিলারা হাফিজ ছিলেন এমন এক শিক্ষানেত্রী, যিনি নিজের কর্মে প্রমাণ করেছেন—শিক্ষা শুধু পেশা নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। প্রভাষক থেকে অধ্যক্ষ, অধ্যক্ষ থেকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান, সেখান থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক—তাঁর প্রতিটি পদচিহ্নে আছে নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা ও সেবার দৃষ্টান্ত।
সব শেষে বলবো মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, যিনি সদ্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের পেছনে একজন সহযোদ্ধা, একজন নীরব প্রেরণা, একজন অবিচল সঙ্গী হিসেবে অধ্যাপক দিলারা হাফিজ নিশ্চয়ই ছিলেন অপরিহার্য শক্তি।একজন সহধর্মিণী শুধু সংসারসঙ্গী নন; তিনি জীবনের কঠিনতম সময়ের সহযাত্রী। যখন একজন মানুষ রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকেন, তখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের শান্তি ও স্থিতি বহুলাংশে নির্ভর করে ঘরের মানুষের ওপর। দিলারা হাফিজ সেই স্থিতির প্রতীক। এমন মানুষদের অবদান ইতিহাসের শিরোনামে লেখা না থাকলেও, ইতিহাসের ভেতরের সত্যে তাঁরা অমর হয়ে থাকেন।



