আবদুর রহমান
ভারতে নব্যউদারনীতি ও হিন্দুত্ব রাজনীতির এক অদ্ভুত, কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী জোট দেশটিকে আজ একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯১ সালের পর থেকে ভারতের অর্থনীতি ধীরে ধীরে বাজারমুখী নীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে—বেসরকারীকরণ, কর্পোরেট কর কমানো, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য নিয়ম শিথিল, শ্রম অধিকার দুর্বল করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া। এই নীতিগুলোর ফলে ধনী শ্রেণি এবং কর্পোরেটদের সম্পদ দ্রুত বাড়তে থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তে থাকে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি ও অসমতা। নব্যউদারনীতির এই অন্তর্নিহিত সংকট—যা কৃষক আত্মহত্যা, শ্রমিক বেকারত্ব, শিক্ষায়–চিকিৎসায় ব্যয় বৃদ্ধির মতো বিপর্যয় তৈরি করে—সরকারের বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই জনরোষ সৃষ্টি করতে পারত। কিন্তু এখানেই বিজেপি-আরএসএস জোট হিন্দুত্ব রাজনীতিকে ব্যবহার করে একটি বিচ্ছিন্ন করা, বিভাজিত করা ও আবেগ-নিয়ন্ত্রিত সমাজ সৃষ্টি করেছে, যেখানে বাস্তব সমস্যার বদলে ধর্ম, পরিচয়, মুসলমান-বিদ্বেষই রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
এই বিভাজন কোনও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়। ব্রিটিশ শাসকের “ডিভাইড অ্যান্ড রুল” নীতি থেকে শুরু করে উনিশ শতকের ব্রাহ্মণ্যবাদী পুনরুজ্জীবন, আর্য সমাজের সংস্কার আন্দোলন, হিন্দু মহাসভার উত্থান এবং পরে আরএসএস—সবই মিলে শত বছরের একটি প্রকল্প গড়ে ওঠে, যার লক্ষ্য ছিল হিন্দুদের একটি ‘একক’ রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপান্তর করা এবং মুসলমানদের “অন্য” হিসেবে চিহ্নিত করা। এই ঐতিহাসিক যাত্রাপথের ফলেই বিজেপি আজ হিন্দুত্বের ওপর দাঁড়ানো একটি বিশাল ভোটব্যাংক পায়, যা নব্যউদারনৈতিক ব্যর্থতাকে আড়াল করতে ব্যবহার করা হয়।
এই প্রকল্পের পরীক্ষাগার ছিল গুজরাট, যেখানে নরেন্দ্র মোদি ২০০১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ব্যাপক মেরুকরণ, ২০০২ দাঙ্গার মতো গণহত্যার মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সমর্থন পোক্ত করেন। গুজরাটে দেখা যায় হিন্দুত্ব ও কর্পোরেট স্বার্থের নিখুঁত সমন্বয়—আদানি, রিলায়েন্স, টাটা প্রভৃতি কর্পোরেট গ্রুপদের জন্য সস্তা জমি, ট্যাক্স ছাড়, নিয়ম শিথিলতা, বিদেশি বিনিয়োগে সুবিধা—সবই মোদির নেতৃত্বে এক অভূতপূর্ব মাত্রায় বেড়ে যায়। একই সময়ে মুসলমানরা শহর থেকে উৎখাত হয়ে গেটোর মতো এলাকায় আটকে পড়ে; তাদের ব্যবসা ধ্বংস হয়; রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করা হয়। অর্থাৎ, মোদির “গুজরাট মডেল” ছিল ঘৃণা-নির্ভর রাজনৈতিক মেরুকরণ + কর্পোরেটের জন্য অর্থনৈতিক স্বর্গ—একই কাঠামো।
২০১৪ সালের পর এই মডেল জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োগ করা হয়। মোদির রাজনীতিতে দেখা যায় ফ্যাসিবাদের ক্লাসিক লক্ষণ—
1. নেতার ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা,
2. অতীতের মিথিক “হিন্দু স্বর্ণযুগ” ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি,
3. সংখ্যালঘুদের (বিশেষত মুসলমানদের) শত্রু হিসেবে চিত্রিত করা,
4. সত্যকে বিকৃত করা,
5. মিডিয়া দখল,
6. বিচারব্যবস্থা ও তদন্ত সংস্থা দিয়ে বিরোধীকে দমন করা,
7. সমান্তরালে জনগণের কাছে নিজের “অবতারসুলভ” ইমেজ তৈরি করা।
এদিকে নব্যউদারনৈতিক কাঠামো আরও দৃঢ় হয়েছে—কর্পোরেটদের কর কমানো, লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ মওকুফ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি, ৪০ বছরের লিজ চুক্তি, শ্রম আইন ভেঙে নতুন labour code করে “hire and fire” নীতি চালু করা, কৃষকদের বিরুদ্ধে তিনটি কৃষি আইন আনা, ব্যাংকিং খাতে কর্পোরেট প্রভাব বাড়ানো। নির্বাচনী বন্ডের মতো গোপন অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্পোরেটরা বিজেপিকে অঢেল টাকা দিয়েছে, যার বদলে তারা রাষ্ট্রনীতিতে প্রায় সরাসরি প্রভাব খাটিয়েছে।
ভারতে আজ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ার পথে—পার্লামেন্টের ভূমিকা সীমিত, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত, মিডিয়া প্রায় পুরোপুরি সরকারপন্থী, ভিন্নমত পোষণকারীদের “দেশদ্রোহী”, “নকশাল”, “শহুরে সন্ত্রাসী” বলা হয়, আর নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংকুচিত। সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, লিঞ্চিং, মসজিদ–মাদ্রাসা আক্রমণ, হিজাব-বিফ নিষেধাজ্ঞা—সব কিছুই নতুন ভারতের “নর্মাল” হয়ে গেছে। বাঙালি, কাশ্মীরি, দলিত, আদিবাসী—সবাই রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যায় দমন-পীড়নের শিকার।
সব মিলিয়ে ভারতের সংকট আজ শুধু ধর্মীয় উগ্রবাদ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ কার্পোরেট–রাষ্ট্র–হিন্দুত্ব জোটের ফ্যাসিবাদী প্রকল্প, যেখানে কর্পোরেটরা অর্থনৈতিক সুবিধা পায়, আর হিন্দুত্ব জনগণকে বিভক্ত ও পরিচালিত রাখে। নব্যউদারনীতি মানুষের জীবনে সংকট তৈরি করে, আর হিন্দুত্ব সেই সংকটের ব্যাখ্যা তৈরি করে—“সমস্যা হল মুসলমানরা/বহিরাগতরা/লিবারেলরা”—যা ফ্যাসিবাদের ক্লাসিক কৌশল। ফলে ভারতের গণতন্ত্র, সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক ন্যায়—সবকিছুই আজ ভেঙে পড়ার মুখে।



