০৪/০২/২০২৬, ৯:১০ পূর্বাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের দায়বদ্ধতা

    আমিরুল ইসলাম কাগজী

    অতি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক কিছু গণমাধ্যমে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে যেভাবে অতিরঞ্জিত ও একপাক্ষিক বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে, তার বিপরীতে সরকারের প্রকাশিত পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত সোমবার তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে এক স্ট্যাটাসে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু-সংশ্লিষ্ট যেসব অপরাধমূলক ঘটনার কথা জানা গেছে সেগুলোর অধিকাংশই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নয়। বাংলাদেশের জন্য এটা নতুন কিছু নয়। সংখ্যালঘুদের সঙ্গে ঘটনা ঘটলেই সেটাকে সাম্প্রদায়িক লেবাস দেওয়ার একটা চেষ্টা চালানো হয়। এখানেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

    সরকারি নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে—২০২৫ সালে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ৭১টি ছিল প্রকৃত অর্থে সাম্প্রদায়িক।অর্থাৎ মোট ঘটনার প্রায় ৮৯ শতাংশই ছিল সাধারণ অপরাধ বা সামাজিক বিরোধের ফল—যেমন জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব, পারিবারিক শত্রুতা, চুরি-ডাকাতি, ব্যক্তিগত আক্রোশ বা রাজনৈতিক বিরোধ। এসব ঘটনার সঙ্গে ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের কোনো সরাসরি সম্পর্ক ছিল না।

    কেন এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ?

    এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে সংঘটিত প্রতিটি অপরাধকে ‘সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন’ হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতাবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর। এতে একদিকে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে প্রকৃত সাম্প্রদায়িক অপরাধগুলোর গুরুত্বও আড়ালে চলে যায়। একটি কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার সেটা হলো প্রতিটি অপরাধ উদ্বেগ জনক। সেটাকে উপেক্ষা করা যাবে না। অপরাধের বিচার হতেই হবে।

    সরকারি হিসাবে যে ৭১টি ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ছিল মন্দিরে হামলা, অগ্নিসংযোগ, প্রতিমা ভাঙচুর, ধর্মীয় সম্পত্তি দখল এবং একটি হত্যাকাণ্ড। এসব ঘটনায় ইতোমধ্যে ডজনের বেশি মামলা হয়েছে, বহু অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান।

    রাষ্ট্রের ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা

    এই পর্যালোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সরকার কোনো ঘটনাকে অস্বীকার করেনি বা ধামাচাপা দেয়নি। বরং প্রতিটি অভিযোগকে নথিভুক্ত করে, তার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে।

    এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ সরকার সংখ্যালঘু নিরাপত্তাকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে নয়, বরং একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে দেখে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব—এই নীতিতেই সরকার কাজ করছে।

    আন্তর্জাতিক মহলে ভুল বার্তা কেন ক্ষতিকর

    বিদেশি কিছু মিডিয়া ও গোষ্ঠী যখন প্রতিটি অপরাধকে ‘হিন্দু নির্যাতন’ বা ‘সংখ্যালঘু নিপীড়ন’ বলে প্রচার করে, তখন তা বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতাকে বিকৃতভাবে তুলে ধরে।

    এর ফলে ১) বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়,২) বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে,৩) প্রকৃত অপরাধীদের বদলে পুরো রাষ্ট্র ও সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় ,৪)এ ধরনের বয়ান কেবল বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণাকেই শক্তিশালী করে।

    বাস্তবতা স্বীকার করাই শক্তি

    এ কথা সত্য—বাংলাদেশে বিচ্ছিন্ন সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটেছে এবং সেগুলো গুরুতর অপরাধ। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, রাষ্ট্র সেগুলোকে প্রশ্রয় দেয়নি বরং আইনের আওতায় এনেছে।

    সরকারের প্রকাশিত এই পরিসংখ্যান দেখায়—

    ১. বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা রাষ্ট্রীয় নীতি নয়

    ২. অধিকাংশ ঘটনা সামাজিক-আইনশৃঙ্খলাজনিত অপরাধ

    ৩. প্রকৃত সাম্প্রদায়িক অপরাধে আইন প্রয়োগে সরকার সক্রিয়।
    একটি কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার- বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ,খ্রিস্টান এবং অন্যান্য বিশ্বাসের মানুষের দেশ। এখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা কেবল সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়, একটি নৈতিক কর্তব্যও বটে। সেই কারণে গত এক বছর ঘটে যাওয়া সকল ঘটনার একটি তদন্ত রিপোর্ট জনসমক্ষে উপস্থাপন করা হয়েছে। যে রিপোর্টে চ্যালেঞ্জ অস্বীকার করা হয়নি, আবার স্বস্তিদায়ক বলেও দাবি করা হয়নি বরং এটি বৃহত্তর জাতীয় প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর প্রভাব ফেলছে- এমন অপরাধ প্রবণতার একটি বাস্তব ও প্রমাণ ভিত্তিক চিত্র তুলে ধরার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা দ্বারা নির্ধারিত হয় না বরং এগুলো মোকাবিলার সম্মিলিত প্রচেষ্টার দ্বারা নির্ধারিত হয়। এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেলেও এটি স্পষ্ট বাংলাদেশের সব নাগরিকের জন্য- মুসলিম, হিন্দু ও অন্য সবার জন্য আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির পথে রয়েছে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়