দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক নতুন মোড় এসেছে। পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু দু’দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়নি, বরং ভারতীয় কূটনৈতিক ও কৌশলগত মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই চুক্তিকে সাধারণ সামরিক সহযোগিতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তি-সমীকরণের ইঙ্গিত বহন করছে।
*কূটনৈতিক প্রতীকী আলিঙ্গন*
রিয়াদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যখন কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে একে অপরকে আলিঙ্গন করলেন, সেই মুহূর্তে বার্তাটি স্পষ্ট ছিল। ইসলামাবাদ—যেটি আর্থিক দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে—আবারও সৌদি তেলের অর্থ এবং কূটনৈতিক ছাতার নিচে নতুন শক্তি খুঁজে পেল। আর রিয়াদও দেখাল, তারা ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার তোয়াক্কা না করেই পাকিস্তানকে পাশে দাঁড় করাতে প্রস্তুত।
ভারতের নিরাপত্তা সমীকরণে চাপ
চুক্তির ধারা অনুযায়ী, পাকিস্তান বা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যে কোনো আগ্রাসন উভয় দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে গণ্য হবে। এটি কার্যত ভারতের জন্য এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করে। দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র—ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি বরাবরই বিদ্যমান। সেখানে সৌদি আরবের কূটনৈতিক বা সামরিক ভূমিকা নতুন অনিশ্চয়তা যুক্ত করছে।
পাকিস্তানের কৌশলগত জাল
চীন ও তুরস্ক ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক মিত্র। এবার সৌদি আরব যুক্ত হওয়ায় ইসলামাবাদের জন্য ত্রিমুখী পৃষ্ঠপোষকতার জাল তৈরি হলো। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পাকিস্তান এই পৃষ্ঠপোষকতার জোরেই সামরিক শক্তি বাড়াতে পারবে, যা ভারতের কৌশলগত চাপ বহুগুণে বাড়িয়ে তুলবে।
ভারত-সৌদি সম্পর্কে দ্বন্দ্ব
গত এক দশকে ভারত সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেছে—তেল আমদানি থেকে শুরু করে বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, এমনকি সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতাও। কিন্তু এই প্রতিরক্ষা চুক্তি সেই আস্থার সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ভারতের জন্য বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, রিয়াদ কি এখন থেকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি ভারতীয় বাজার ও বিনিয়োগকে?
“ইসলামিক ন্যাটো”র শঙ্কা
বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌদি-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা কেবল দ্বিপাক্ষিক নয়, বরং একটি বৃহত্তর ইসলামী সামরিক জোটের রূপ নিতে পারে। তুরস্ক, কাতার কিংবা অন্যান্য গালফ রাষ্ট্র যদি এ পথে এগোয়, তবে ভারত তার পশ্চিমমুখী কূটনৈতিক কৌশলে মারাত্মক বাধার সম্মুখীন হবে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হবে, যেখানে ভারতের প্রবেশাধিকার সীমিত হবে।



