০৪/০২/২০২৬, ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    ভারতের ‘সফট পাওয়ার’ ভাঙনের রাজনীতি

    আমিরুল ইসলাম কাগজী

    একসময় ভারত নিজেকে তুলে ধরত “বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র”, সহনশীলতা, বহুত্ববাদ আর সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের দেশ হিসেবে। গান, সিনেমা, ক্রিকেট এসব ছিল ভারতের ‘সফট পাওয়ার’-এর প্রধান অস্ত্র। কিন্তু আজ সেই অস্ত্রগুলোই উল্টো হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভারতের জন্য বিব্রতকর বোঝা। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে—ভারতের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক ও বিভাজনমূলক রাজনীতি এখন আর দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়ছে গোটা বিশ্বে।

    এ আর রহমানকে আক্রমণ: মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কফিনে আরেকটি পেরেক

    এ আর রহমান—ভারতের সাংস্কৃতিক দূতদের অন্যতম বড় নাম। তাঁর গান শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বে ভারতের পরিচয় বহন করেছে। কিন্তু সম্প্রতি তিনি যখন বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুম্বাইয়ের সৃজনশীল পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন এবং সাম্প্রদায়িক ভাবনার উত্থান নিয়ে ইঙ্গিত দিলেন, তখনই বিজেপি-ঘনিষ্ঠ ট্রোল বাহিনী তাঁর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

    একজন বিশ্বমানের শিল্পী, যিনি ভারতের হয়ে অস্কার, গ্র্যামি জিতেছেন, তাকেও যদি নিজের দেশে কথা বলার জন্য ‘দেশপ্রেমের সনদ’ দিতে হয়—তাহলে বুঝতে হবে ভারত এখন আর মতপ্রকাশের নিরাপদ জায়গা নয়। “আল্লাহ রাখা রহমান”(সংক্ষেপে এ আর রহমান) নামের একজন মুসলিম শিল্পী যদি নিজের দেশেই কোণঠাসা হন, তবে ভারতের বহুত্ববাদের গল্পটা আসলে কতটা ফাঁপা, সেটাই বিশ্ব দেখছে।

    ক্রিকেটেও বিজেপির রাজনীতি: আইসিসি ‘ইন্টারন্যাশনাল’ নয় ‘ইন্ডিয়ান’?
    ক্রিকেট ভারতের সবচেয়ে বড় ‘সফট পাওয়ার’। কিন্তু সেই ক্রিকেটকেও এখন বিজেপির ঘরোয়া রাজনীতির হাতিয়ার বানানো হচ্ছে। বিসিসিআইয়ের ক্ষমতা, আইসিসিতে ভারতের দাপট—সব মিলিয়ে ভারত কার্যত ক্রিকেট দুনিয়ার অঘোষিত শাসক।

    বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়া এবং তার জেরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া শুধু একটি ক্রীড়া ইস্যু নয়—এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ চাইছে নিরপেক্ষ ভেন্যু, কিন্তু আইসিসি তাতে রাজি নয়—কারণ সেখানে ভারতের প্রভাব।

    অথচ ভারত নিজেই পাকিস্তানের সঙ্গে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বহুবার ম্যাচ সরিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে! তাহলে বাংলাদেশ চাইলে সেটাকে ‘সমস্যা’ বলা হচ্ছে কেন? কারণ দিল্লির রাজনীতি এখন ক্রিকেটকেও কূটনৈতিক চাপের অস্ত্রে পরিণত করেছে।

    এর পেছনে রয়েছে বিজেপির সেই পুরোনো প্রচারণা—বাংলাদেশি “অনুপ্রবেশকারী”, হিন্দু নিপীড়নের অভিযোগকে ভোটের ইস্যু বানানো। ক্রিকেট মাঠেও তার প্রতিফলন ঘটছে। এতে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে একজন নিরপেক্ষ ক্রীড়া আয়োজক হিসেবে।

    বলিউডের সংকীর্ণতা: বিশ্ববাজারে হিন্দুত্ববাদী সিনেমার ধাক্কা
    একসময় বলিউড ছিল বহুত্ববাদী ভারতের প্রতীক। রাজ কাপুর থেকে শাহরুখ খান—ভারতীয় সিনেমা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়েছিল তার মানবিকতা, প্রেম আর সংস্কৃতির মিশ্রণের কারণে।

    কিন্তু এখন বলিউড ক্রমশ পরিণত হচ্ছে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের প্রচারমাধ্যমে। ‘ধুরন্ধর’, ‘বর্ডার ২’, ‘গাদ্দার ২’-এর মতো পাকিস্তানবিরোধী, মুসলিমবিদ্বেষী বা অতিরাষ্ট্রবাদী সিনেমা একের পর এক নিষিদ্ধ হচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে—বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

    এগুলো শুধু সিনেমা নিষিদ্ধ হওয়ার খবর নয়, বরং ভারতের সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা হারানোর দলিল। বিশ্ব বুঝে গেছে ভারতীয় সিনেমা আর আগের মতো “সবার জন্য” নয়; এখন তা একটি নির্দিষ্ট সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শনের বাহক।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়