জেড নিউজ, ঢাকা:
নানা কারণে দেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা ও বিনিয়োগে আস্থা কম ছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এবার সেই অপেক্ষার অবসান হলো। দেশ এখন নতুন সরকার গঠনের পথে, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কমার আশা করছে সবাই। এর সুফল ধীরে ধীরে সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হবে।
এই বাস্তবতায় নতুন সরকার শপথের সঙ্গে সঙ্গে দেশের ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশ পুনরুদ্ধারের বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হবে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, সরকার প্রথমে আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের দায়িত্বে বসিয়ে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ স্থিতিশীল করবে।
এদিকে এ চেষ্টায় দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা কাটিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এ কাজের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে ছয় মূল চ্যালেঞ্জ—আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি ও ডলার সংকট মোকাবিলা, ব্যাংক খাত ও আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি তৈরি।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা এবং অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা মিলিয়ে স্পষ্ট, সরকারের সামনে সময়মতো এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ততোধিক চাপ রয়েছে। নতুন নীতি গ্রহণ, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারলে এই চাপ মোকাবিলার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও বিনিয়োগে আস্থা পুনরুদ্ধারের পথ ধরানো সম্ভব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ফলে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর ব্যবসায়ী সমাজ স্বস্তি পেয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা ফিরবে। তবে এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব মোকাবিলায় আইএমএফ সমর্থিত নীতিমালা সহায়ক হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ যোগ করেন, বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়াতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, চাঁদাবাজি বন্ধ ও ব্যাংক খাতের কার্যকর সংস্কার জরুরি। এ ছাড়া অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ থাই চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও ভালো ভোটার উপস্থিতি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি ও ডলার সংকট এবং বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের ঘাটতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিই এখন এই অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল মনে করেন, বিগত সময়ে আমলাতান্ত্রিক ‘পাসিং দ্য পিলো’ সংস্কৃতি ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের হতাশ করছে। তিনি জানান, নতুন সরকারের নেতৃত্বে সংসদ কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং বস্ত্র খাতের সমস্যা সমাধান করে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেবে। পাশাপাশি, বাণিজ্য সংগঠনগুলোকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে নিয়মিত পরামর্শের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণ করবে। ব্যবসায়িক সংগঠনেও সংস্কার আনবে।
বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনিশ্চয়তা কমিয়েছে। তবে বিনিয়োগকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আইনশৃঙ্খলা, সুশাসন, সঠিক রাজস্বনীতি, সহজ ব্যবসা পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়াতে হবে। এসব সংস্কার এক দিনে ফল দেবে না, তবে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।



