।।আমিরুল ইসলাম কাগজী।।
বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অস্বাভাবিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের দাবি—ঢাকা নয়, বরং দিল্লির নীতিনির্ধারক ও গোয়েন্দা পরিমণ্ডল এখন সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ব্যাহত করতে মাঠে নেমেছে। তাদের প্রধান টার্গেট শুধু নির্বাচন নয়, বরং জুলাই সনদের আওতায় হতে যাওয়া গণভোটকে বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য করে তোলা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করে শেখ হাসিনাকে নিষ্কণ্টক করানোর একটা পাঁয়তারা চালাচ্ছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা। এইজন্য তাকে দিয়ে দিল্লিতে নানা কায়দায় বক্তব্য দেওয়ানোর চেষ্টা চলছে।
হাসিনাকে সামনে আনার কূটনৈতিক খেলা
২৩ জানুয়ারি দিল্লিতে আয়োজিত ‘Safe Democracy in Bangladesh’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইংরেজি অডিও বার্তা প্রচার—এই বড় ধরনের হস্তক্ষেপের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ। সেখানে হাসিনা সরাসরি নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানিয়ে সহিংসতার ইন্ধন দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর ‘‘বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত’’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, পুরো ইভেন্টটি তদারকি করেছে ভারতীয় ডিপ স্টেট। এমনকি হাসিনার আরও আক্রমণাত্মক বাংলা অডিওও রেকর্ড করা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত প্রচার করা হয়নি।
কেন এত উদ্বিগ্ন দিল্লি?
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই অস্থিরতা ও চাঞ্চল্যর মূল কারণ তিনটি—
১। আওয়ামী লীগ নেই নির্বাচনে—ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সুবিধাভোগী দল।
২। জাতীয় পার্টির অবস্থান দুর্বল—দিল্লির আরেক ‘বিশ্বস্ত’ ব্যাকআপ বলয়ও কার্যত ভঙ্গুর।
৩। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ইসলামী জোটের উত্থান—যা ভারতীয় নিরাপত্তা কৌশলের বিপরীত।
এ অবস্থায় নির্বাচন ভন্ডুল করা, ভোটার উপস্থিতি ৫০ শতাংশের নিচে নামিয়ে দেওয়া এবং গণভোটে ‘না’ ভোটকে উৎসাহিত করা—এই তিন লক্ষ্য পূরণে দিল্লির গোয়েন্দা পরিমণ্ডল সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে বলে অভিযোগ সূত্রগুলোর।
ড. ইউনূসকে লক্ষ্য করে প্রচারযুদ্ধ
হাসিনার বার্তায় দেখা যায়—ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে খুনি, ফ্যাসিস্ট, ক্ষমতালোভী ও বিদেশি শক্তির দালাল আখ্যা দিয়ে প্রচার চালানো হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে—এই বার্তার স্ক্রিপ্ট তৈরি থেকে প্রচার পর্যন্ত ভারতীয় সংস্থাগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। দিল্লি প্রেস ক্লাবের সভাপতি গৌতম লাহিড়ির সাম্প্রতিক মন্তব্যও একই প্রচারযুদ্ধের অংশ।
বাংলাদেশের সরকারি প্রতিক্রিয়া: ‘স্পষ্ট অবমাননা’
বাংলাদেশ সরকার বলেছে—
দিল্লিতে হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ,
* প্রতিপক্ষকে উসকানি দিয়ে নির্বাচন ভন্ডুলের চেষ্টা,
* দুই দেশের সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের পরিপন্থী পদক্ষেপ।
সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে—নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো সহিংসতা বা ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ‘গভীর ষড়যন্ত্র’
অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেছেন—ভারত শুরু থেকেই বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। হাসিনার অডিও প্রচার তারই অংশ এবং এটি সরাসরি নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র।
প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী মনে করছেন—BNP–জামায়াত জোটের সম্ভাব্য উত্থান দিল্লিকে অস্বস্তিতে ফেলেছে, তাই নির্বাচন ও গণভোট উভয় ক্ষেত্রেই বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা চলছে।
সাবেক সেনাপ্রধানের কঠোর মন্তব্য
সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেছেন—
ভারত দণ্ডিত ব্যক্তিকে উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে দিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে,
1. এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ,
2. দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি আরও সতর্ক করেছেন দালাইলামাকে আশ্রয় দেওয়ার পর চীনের সঙ্গে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ভারত একই ধরনের পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে।
ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা চিন্তা করে তাহলে তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণের মনের ভাব বুঝতে হবে। শুধুমাত্র শেখ হাসিনাকে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করলে বাংলাদেশের জনগণ সেটা বরদাস্ত করবে না। ভারতকে এটা বুঝে শুনেই এগোতে হবে। বিগত ১৬-১৭ বছর শেখ হাসিনাকে দিয়ে যে সমস্ত অপকর্ম এবং সুযোগ-সুবিধা ভারত নিয়েছে এখন সেটা সম্ভব নয়। ভারতকে অবশ্যই বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সমমর্যাদার ভিত্তিতে করতে হবে। ব্যক্তি বিশেষের সঙ্গে নয় সরকারের সঙ্গেই করতে হবে সম্পর্ক।



