০৬/০২/২০২৬, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    নির্বাচন ঘিরে অপতথ্যের বিস্তারঃ সরকারের সক্রিয়তা কাম্য

    আমিরুল ইসলাম কাগজী।

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    জেড নিউজ, ঢাকা:

    অনেক জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট। বাংলাদেশে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তোরণের মাইলফলক হিসেবে নির্বাচনটি ইতোমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে। স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী নির্বাচনে নিরাপত্তা দিতে নিযুক্ত হয়েছেন। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিদেশী সাংবাদিক এবং পর্যবেক্ষকদের জন্য বাংলাদেশ ছিলো এক নিষিদ্ধ দেশ। নির্বাচন আয়োজন করা হতো যথাসম্ভব গোপনীয়তায়। এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের দুয়ার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা এবং প্রয়োগ এখন পর্যন্ত আশাব্যাঞ্জক। বাংলাদেশের জনগন হিসেবে আমাদের আশাবাদ নির্বাচনী সংস্কৃতির এই সুষ্ঠু চর্চা আগামী নির্বাচনগুলোতে অব্যাহত থাকবে।

    বাংলাদেশের নির্বাচনে মাঠে এবং কেন্দ্রে যেসব প্রশাসনিক এবং আইনি চ্যালেঞ্জ ছিলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছে। তবে নির্বাচনের প্রস্তুতিকাল থেকে বিশ্লেষকেরা বলে আসছিলেন বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে অপতথ্য এবং এআই নির্মিত ডিপফেইক কন্টেন্ট। পার্শ্ববর্তী একটি দেশ এবং তাদের এদেশীয় প্রক্সি শক্তি নির্বাচন বানচালে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিলো। কিন্তু মাও সে তুঙের সেই অমর বাণী- সংঘবদ্ধ মানুষ পারমাণবিক বোমার চেয়ে শক্তিশালী- বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনেকাংশে ফলে গিয়েছে। জুলাই গণআন্দোলনের ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনা বাংলাদেশের মানুষকে যে ঐক্যের সুরে বেঁধেছে সে বাঁধন বহু চেষ্ঠাতেও ছেড়া যায়নি। ফ্যাসিবাদবিরোধী এই চেতনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এক অন্তর্নিহিত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে যা আগামীর দিনে রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক পথে অনেকটা এগিয়ে রাখবে। মুশকিল হলো রাষ্ট্রের দুশমনেরা পরাজয়েও থেমে নেই। পাচারের বিপুল অর্থ আর পার্শ্ববর্তী একটি দেশের ইন্ধনের শক্তিতে তারা বারবার এদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। নির্বাচন বানচালে ব্যর্থ হয়ে এখন তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। এই ষড়যন্ত্রে তাদের অস্ত্র হয়ে উঠেছে অপতথ্য আর ডিপফেইক।

    সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা নির্বাচনে পক্ষপাত করছে এমন একটি বয়ান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাজির করেছে একদল ব্যক্তি। তাদের লেখা পড়লে মনে হবে একেকজন প্রখ্যাত কোনো অনুসন্ধানী সাংবাদিক। তারা আবিষ্কার করেছেন গোয়েন্দা সংস্থার লেটারহেডে একটি রাজনৈতিক দলকে ৭৫ শতাংশ ভোট পাইয়ে দেবার নির্দেশনা প্রচার করা হয়েছে। অতীতে যারা এমন অপকর্ম করেছিলেন এমন পরিকল্পনা কেবল তাদের মাথাতেই আসা সম্ভব। এমন তথ্য যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়াচ্ছেন তাদের সবার প্রোফাইলে ঢুকলে একটি সাধারণ সত্য বেড়িয়ে আসে- তারা সবাই কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য। তাদের গুজবের নিশানা বাংলাদেশের সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। গুজবকে বিশ্বাসযোগ্য করতে তারা এসব সংস্থার লেটারহেড ব্যবহার করে তথ্য সরবরাহ করেন। এসব গুজব নির্বাচনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রথমে ভুয়া লেটারহেড ব্যবহার করে এমন একটি গুজব ছড়ানো হয়। পরবর্তীতে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি নিয়ন্ত্রিত এবং পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পরিচালিত বিভিন্ন ফেসবুক ও টুইটার একাউন্ট থেকে একই গুজব কপিপেস্ট করে ছড়ানো হয়। এমন কর্মকাণ্ড নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আশার বিষয় হলো শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা এসব গুজববাজ একাউন্টগুলোকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হচ্ছেন। সত্যের সঙ্গে মিথ্যার দ্বন্দ্বে চিরদিন সত্য বিজয়ী হয়।

    এসব গুজব চিহ্নিত করার সহজ উপায় হলো- গুজবে বানান ভুল থাকবে। গুজবে এমন ফন্ট ব্যবহার করা হবে যা সরকারী কাজে ব্যবহার করা হয় না। এসব ক্ষেত্রে স্মারক নম্বরের স্থলে ব্যবহার করা হবে আজগুবি কিছু অর্থহীন সংখ্যা। জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার প্যাড ব্যবহার করে ছড়িয়ে পড়া গুজবটি পড়লে দেখা যায় প্যাডটি প্রেরণ করা হয়েছে সংস্থার প্রধানের ঠিকানায়। অর্থাৎ সংস্থাটি সংস্থার প্রধানকে নির্দেশনা পাঠাচ্ছে। যারা সরকারি কাগজপত্রের সঙ্গে পরিচিত তারা সহজেই এসব মিথ্যাচার ধরে ফেলতে পারবেন। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা একটি রাজনৈতিক দলকে ৭৫ শতাংশ ভোট পাইয়ে বিজয়ী করবে এমন একটি নির্দেশনা সংবলিত নির্দেশনা সংস্থার লেটারহেড ব্যবহার করে তৈরি করেন সুব্রত কুমার সরকার নামের এক ব্যক্তি। সুব্রতের প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা যায় তিনি আওয়ামী লীগের কর্মী। গোপন নথি উন্মোচনের নামে তিনি নিজের তৈরিকৃত লেটারহেড তার প্রোফাইল থেকে আপলোড করেন। তার এই ভুয়া লেটারহেড আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেইজ থেকে আপলোড করা হয়। যেকোনো সচেতন ব্যক্তি গোপন নথির চেহারা দেখলেই বুঝবেন এ নথি সর্বসমক্ষে প্রকাশের জন্য-ই তৈরি করা হয়েছিলো এবং এ নথি ভুয়া। তবে বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া লিটারেসির হার কম হওয়ায় দেশের বড় অংশের জনগন এসব গুজবে বিভ্রান্ত হবেন এমন আশংকা থেকেই যায়।

    নির্বাচন হবে নাকি হবে না এমন আশঙ্কা বাংলাদেশের মানুষের মন থেকে দূর হয়েছে। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে কিনা সেই আশঙ্কাও নেই। দীর্ঘদিন পর ভোট দেবার সুযোগ পেয়ে অধিকাংশ ভোটার কেন্দ্রে আসবেন। আন্তর্জাতিকভাবে ৬০ শতাংশ ভোট পড়লে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে এরচেয়ে অনেক বেশি ভোট পড়বে বলে বিশ্লেষকেরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ফলে নির্বাচন নিয়ে আর কোনো আশঙ্কা নেই। রাতের ভোট বা ভোট গণনায় কারচুপি করার কোনো সুযোগ আইনত রাখা হয়নি। এমতাবস্থায়, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যথা সামরিক বাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদিকে বিতর্কিত করা হয়ে উঠেছে একদল দেশবিরোধী শক্তির প্রধান এজেন্ডা। তারা এসব সংস্থার নামে পক্ষপাত, ভোট বানচাল এমনকি নির্বাচন পিছিয়ে দেয়াসহ নানাবিধ গুজব ছড়াচ্ছে। বাংলাদেশের জনগনকে তাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা রাখতে হবে। জুলাইয়ের পর আর রাষ্ট্রের কোনো সংস্থার জনবিরোধী অবস্থান নেবার সুযোগ নেই। সব সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জুলাইয়ের একটি বড় অর্জন। তবে এটাও সত্য যে সরকারের এসব গুজবকে হালকাভাবে নেয়া উচিত হবে না। সরকার গুজববাজদের বিপক্ষে কঠোর অবস্থান নিবে এবং বিদ্যমান আইনে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির দায়ে তাদের গ্রেপ্তার করবে এমনটাই কাম্য।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়