আমিরুল ইসলাম কাগজী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
বাংলাদেশের সামনে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শুধু আরেকটি নির্বাচন নয়, এটি আমাদের গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং নাগরিক আস্থার বড় পরীক্ষা। বিশ্বজুড়ে যখন কর্তৃত্ববাদী শাসন শক্তিশালী হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের এই ভোট গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হলে তা কেবল ঢাকার জন্য নয়, বহু দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্যও আশার বার্তা হতে পারে। আর ব্যর্থ হলে, গণতান্ত্রিক উত্তরণ যে কতটা ভঙ্গুর, সেটিই আবার প্রমাণ হবে।
গত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশ এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে নির্বাচন নিয়মিত হলেও প্রতিযোগিতা ছিল না। বিরোধী রাজনীতির ওপর চাপ, আদালত ও প্রশাসনের রাজনৈতিক প্রভাব, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন—এসব মিলিয়ে মানুষের মনে এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছিল। ভোট ছিল, কিন্তু ভোটের শক্তি ছিল না।
২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলন সেই অনাস্থার দেয়ালে ফাটল ধরায়। শুরু হয়েছিল একটি দাবি দিয়ে, পরে তা রূপ নেয় বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষায়! দমননীতি, ভয় আর একচেটিয়া ক্ষমতার বিরুদ্ধে জনগণের সমবেত উচ্চারণে। এই পরিবর্তন কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ বা ক্ষমতার অন্দরের দর-কষাকষিতে আসেনি, এসেছিল রাস্তায়, ক্যাম্পাসে, পাড়া-মহল্লায় গড়ে ওঠা জনমতের ঢেউ থেকে। তবে ইতিহাস সতর্ক করে দেয় এ ধরনের জাগরণ ক্ষণস্থায়ীও হতে পারে। আন্দোলনের শক্তিকে টেকসই করতে হলে দরকার প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, পেশাদার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, এবং ভয়মুক্ত গণমাধ্যম। অন্যথায়, আশা দ্রুতই হতাশায় রূপ নেয়; মানুষের মনে আবার ফিরে আসে সেই পুরোনো ভাবনা—“কিছুই বদলাবে না।”
নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, প্রার্থীদের সমান সুযোগ, এবং ভোটের পরে ফলাফল মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি—এসবই নির্ধারণ করবে ১২ ফেব্রুয়ারি সত্যিই “গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন” ঘটাতে পারল কি না।
এ নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনমনে “ভয়ের রাজনীতি” ফিরবে, নাকি “অংশগ্রহণের রাজনীতি” শক্ত হবে। ভোটাররা যদি নিরাপদে কেন্দ্রে যেতে পারেন, সাংবাদিকরা বাধাহীনভাবে তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন করতে পারেন, এবং কোনো পক্ষই সহিংসতার আশ্রয় না নেয় তাহলে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। কিন্তু যদি গুজব, ভয়ভীতি, হামলা বা কারসাজির অভিযোগে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে জনআস্থা আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে যা ভবিষ্যতে আরও অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে।
পশ্চিমা বিশ্বও এই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে ভিন্ন এক কারণে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তীব্র! এখানে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা শক্তির স্বার্থ জড়িত। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আসবে কেবল তখনই, যখন বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল হবে ভোটের মাধ্যমে, এবং পরাজিত পক্ষও আইনগত ও রাজনৈতিক পথে আস্থা রাখবে। অর্থাৎ, গণতন্ত্র এখানে নীতির প্রশ্ন যেমন, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নও তেমন।
১২ ফেব্রুয়ারি ফলাফল যেমনই হোক, সবচেয়ে বড় বিষয় হবে প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন মানে কেবল বিজয়ীর ঘোষণা নয়, এটি নাগরিকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা প্রমাণ, এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের সম্ভাবনা কমিয়ে আনার পথ। বাংলাদেশ যদি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তাহলে ২০২৪-এর জাগরণ কাগজে নয় বাস্তবে একটি নতুন গণতান্ত্রিক অধ্যায়ের ভিত্তি হয়ে উঠবে। আর সেটিই হবে সত্যিকারের “গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ


