আমিরুল ইসলাম কাগজী:
বাংলাদেশের গ্রামবাংলার ইতিহাস, অর্থনীতি ও সভ্যতার সঙ্গে খাল-বিল-নদীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। একসময় এই দেশজুড়ে বিস্তৃত খাল ছিল কৃষির প্রাণ, বর্ষার পানির আধার, নৌপথের সহায়ক এবং ভূপ্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের কারণে প্রমত্তা পদ্মা আজ পানি শূন্য, যমুনা-ব্রহ্মপুত্র হারিয়েছে তার স্রোতধারা মেঘনার উজানে পায়ে হেঁটে পার হয় মানুষ, উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রভূমি আজ ফেটে চৌচির। এর পাশাপাশি লোভী ভূমি দস্যুদের দখলবাজি, ভরাট, অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের কারণে অসংখ্য খাল আজ মৃতপ্রায়। এর ফলে একদিকে বর্ষায় জলাবদ্ধতা বাড়ছে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে কৃষক পড়ছেন পানির সংকটে। এই বাস্তবতায় খাল খনন কর্মসূচি আবার শুরু করা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী, সময়োপযোগী ও জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ।
খাল খনন মানে শুধু মাটি কাটা নয়—এটি প্রকৃতপক্ষে কৃষি, পরিবেশ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণের এক সুদূরপ্রসারী কর্মসূচি। বর্ষাকালে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি যদি খালগুলোতে সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে তা শুষ্ক মৌসুমে সেচের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এতে কৃষকের সেচ ব্যয় কমবে, ফসল উৎপাদন বাড়বে এবং জমির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে, ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধীরে ধীরে উপরে উঠবে—যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও কৃষি উভয়ের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
বাংলাদেশ আজ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। কখনও অতিবৃষ্টি, কখনও খরা—প্রকৃতির এই অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করতে হলে আমাদের প্রয়োজন টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা। সেই জায়গা থেকে খাল খনন কর্মসূচি নিছক উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক কৌশলগত উদ্যোগ। জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষিতে সেচ সুবিধা, মৎস্য সম্পদের সম্ভাবনা, স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন—সবকিছুর সঙ্গেই খালের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তবে খালের পাশাপাশি শুকিয়ে গেছে যেসব নদী-নালা সেগুলো উদ্ধার করা খুবই জরুরী, খনন করা প্রয়োজন। প্রত্যাশা করা যায় সেই কাজও খুব দ্রুত শুরু হবে।
এই মহৎ ও বাস্তবমুখী উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষভাবে প্রশংসার দাবিদার। দেশের কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তার দূরদর্শী চিন্তা ইতোমধ্যেই নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তিনি উপলব্ধি করেছেন—বাংলাদেশের উন্নয়ন কেবল নগরকেন্দ্রিক অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এর শিকড় থাকতে হবে গ্রাম, কৃষি ও পানিনির্ভর জীবনব্যবস্থার মধ্যে। খাল খনন কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করে তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যিকার রাষ্ট্রনায়ক সেই, যিনি জনগণের বাস্তব সমস্যা বোঝেন এবং সময়োপযোগী সমাধানের পথ দেখান। একজন রাষ্ট্রনায়ক তার জনগণকে শুধু স্বপ্নই দেখাবেন না কখনো কখনো কাজ করে দেখাবেন। ফ্যামিলি কার্ড-কৃষক কার্ড প্রবর্তনের পাশাপাশি খাল খনন করে কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন করার যে শুভ সূচনা তিনি করলেন তা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের মানুষ স্মরণে রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই পদক্ষেপ কৃষকদের জন্য এক নতুন স্বস্তির বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে সেচের পানি, ডিজেলের মূল্য, বিদ্যুৎ সংকট এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষকরা যে চাপের মধ্যে ছিলেন, খালভিত্তিক পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা তাদের জন্য হতে পারে টেকসই মুক্তির পথ। এটি শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়াবে না, বরং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে, কারণ খাল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
তবে শুধু খাল খনন শুরু করলেই হবে না; প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দখলমুক্ত রাখা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা। যেন একবার খনন করে আবার তা ভরাট হয়ে না যায়। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। খালকে বাঁচাতে হলে খালের জমি রক্ষা করতে হবে, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৬সালে যশোরের শার্শা উপজেলার উলুসি-যদুনাথপুর খাল খনন করার মধ্য দিয়ে সবুজ বিপ্লব শুরু করেছিলেন। জিয়া খাল নামে পরিচিত খালটি খননের উদ্দেশ্য ছিল এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করা, কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা। স্থানীয়দের মতে, এই খাল শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্পই ছিল না; এটি ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ।
উলাশী–যদুনাথপুর খাল খননের ফলে বহু এলাকায় পানি নিষ্কাশন সহজ হয় এবং কৃষকরা সেচের সুবিধা পেয়ে ফসল উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পান। আজও খালটি উন্নয়ন, জনসম্পৃক্ততা এবং বাস্তবমুখী রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের এক স্মারক হিসেবে অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।১৯৭৪ সালে যে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে হয়েছিল সেখান থেকে প্রেসিডেন্ট জিয়ার হাত ধরে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ । লক্ষ্য ছিল একটাই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে দেশকে- দারিদ্র্যমুক্ত হতে হবে দেশের মানুষকে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার হাত থেকে সেই কোদাল আবার হাতে তুলে নিলেন তারই উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্দেশ্য একটাই দেশের মানুষকে ভালো রাখা সুখে রাখা শান্তিতে রাখা।
বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু হওয়া নিঃসন্দেহে এক সুসংবাদ। এটি বাস্তবায়িত হলে গ্রামবাংলার হারানো জলপথ ফিরে পাবে নতুন জীবন, কৃষক ফিরে পাবেন আশার আলো, আর দেশ এগোবে আরও টেকসই উন্নয়নের পথে। আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিচক্ষণ ও জনমুখী নেতৃত্বে এই কর্মসূচি শুধু সফলই হবে না, বরং এটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশের গ্রামীণ পুনর্জাগরণের এক উজ্জ্বল মাইলফলক।
খাল ফিরলে প্রাণ ফিরবে কৃষিতে, বাঁচবে জনপদ


